,

ভোয়ার বিশ্লেষণ : ইসলামিক স্টেটকে পরাজিত করা কঠিন হতে পারে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

91349_1আরটিএনএন

ওয়াশিংটন: যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইসলামিক স্টেটের যোদ্ধাদের উপর ক্রমাগত বোমা হামলার মাধ্যমে সিরিয়ার শহর কোবানির দখল নিতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, আইএস একটি অভিজ্ঞ এবং প্রাণোচ্ছ্বল সংগঠন। কাজেই তাদের পরাজিত করা মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের জন্য অত্যন্ত কঠিন হতে পারে।

সিরিয়ার শহর কোবানির চারপাশে এবং ইরাকের অভ্যন্তরে গত কয়েক দিনের ব্যাপক বিমান হামলা সত্ত্বেও তুর্কি সীমান্ত থেকে বাগদাদের পশ্চিমে কয়েক মাইল পর্যন্ত বিভিন্ন ভবনের ছাদে ইসলামিক স্টেটের সাদা ও কালো পতাকা অনমনীভাবেই উড়ছে।

ইসলামিক ষ্টেট বিশ্বাস করে বর্তমানে তাদের অধীনে ৩০,০০০ থেকে ৩৫,০০০ যোদ্ধা রয়েছে। তাদের রয়েছে ইরাকের সাবেক বাথ পার্টির শীর্ষস্থানীয় সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাসহ অভিজ্ঞ সামরিক নেতা এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণে স্থানীয় সুন্নি উপজাতীয়দের সমর্থন।

সিনিয়র আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক বেন কনাবল বলেন, এটি একটি কার্যকরী সমন্বয়। তারা একই সঙ্গে একাধিক অস্ত্র প্রয়োগে বেশ পারদর্শী। যার অর্থ হচ্ছে তারা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ উভয়ভাবে একযোগে হামলা পরিচালনা করে। তাদের রণকৌশলও বেশ ভাল।

কনাবল বলেন, ‘তারা কঠিন লড়াই করে। দৃশ্যত তাদের মধ্যে ভাল কিছু নেতৃত্ব রয়েছে যার কারণে তাদের নিম্নপর্যায়ের সৈন্যদের মধ্য বিশ্বাস রয়েছে যে, তারা শুধুমাত্র সামনের দিকে অগ্রসর হয়ে কোনো কিছু দখল করতে এবং সব ধরনের অস্ত্রের ব্যবহারেই পারদর্শী নয়, পাল্টা আক্রমণ বিশেষ করে জোটের বিমান হামলার মুখেও তারা বেশ স্থিতিস্থাপক।’

বিশেষজ্ঞরা বলছে, এছাড়াও কয়েকশ অভিজ্ঞ এবং আক্রমণাত্মক চেচেন কমান্ডার ইসলামিক স্টেটের সাথে মিলিত হয়ে যুদ্ধ করছে। এদের মধ্য রয়েছে প্রখ্যাত চেচেন কমান্ডার ওমর আল-শিসানি। ওমর আল-শিসানি ইরাকের রাজধানী বাগদাদের পশ্চিমে অবস্থিত আনবার প্রদেশে গেরিলা স্টাইলে আক্রমণের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

শিসানি এবং তার যোদ্ধারা বাগদাদের আর্ন্তজাতিক বিমান বন্দরের অতি সন্নিকটে অবস্থান করছেন।

কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, এই গোষ্ঠীকে একটি কঠিন সময় অতিক্রম করতে হবে শহরটির দখল নিতে। কারণ, এখানে ৭০ লাখ মানুষ রয়েছে এবং তাদের দখল হতে শহরটি রক্ষা করতে শক্তিশালী শিয়া মিলিশিয়ারা প্রস্তুত  রয়েছে।

মার্কিন সেনাবাহিনীর যুদ্ধ কলেজের গবেষণা অধ্যাপক ডব্লিউ অ্যান্ড্রু টেরিল বলেন, ‘বরং বাগদাদে জাতিগত সংঘাতের প্ররোচণার মাধ্যমে তারা শহরটিকে ধ্বংস করতে চেষ্টা করবে।’

টেরিল বলেন, ‘তারা যতটা সম্ভব বাগদাদে প্রচুর সংখ্যায় আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীদের পাঠাতে চেষ্টা করছে। সুন্নী এলাকাগুলোর মধ্যে কিছু অভ্যুত্থান ঘটাতে এবং দেশটিকে অশান্ত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে তারা।’

প্রোপাগান্ডার জয়

ইসলামিক স্টেট সিরিয়ার শহর কোবানির শত শত মাইল দূরে একটি প্রথাগত সামরিক বাহিনী প্রেরণ করেছে। শহরটি তুরস্কের সীমানা বরাবর একটি সমৃদ্ধ গম চাষের অঞ্চল।

আইএস কর্তৃক প্রচার করা হয়েছে যে তারা ইরাক ও সিরিয়ার উভয় এলাকাতে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সম্পদ আটক করেছে। তারা সেখানে একটি খিলাফত প্রতিষ্ঠা করতে সংকল্পবদ্ধ।

গণতন্ত্রের জন্য প্রতিরক্ষা ফাউন্ডেশন বা ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের একজন সিনিয়র সহকর্মী ডেভিড গারটেনস্টেইন-রস বলেন, জোটের বিমান হামলা সত্ত্বেও কোবানির বিজয় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রোপাগান্ডার বিজয় প্রমাণ করে।

গারটেনস্টেইন-রস বলেন, ‘দেখানো হচ্ছে যে জোটের চলমান বিমান অভিযান তাদের গতিকে মন্থর করতে পারছে না। এ কারণ দেখিয়ে আরো অধিক মানুষকে তাদের প্রতি আকৃষ্ট করা তাদের একটি মডেল। তারা দেখাতে চেষ্টা করছে যে, বিমান হামলা সত্বেও তাদের গতি স্তিমিত হয়নি এই একটি প্রোপাগান্ডাকে সামনে রেখে বাইরের দেশগুলোকে তাদের মানসিকভাবে সহায়তা করতে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে।’

টেরিল বলেন, ‘আবু বকর আল-বাগদাদী ইসলামিক ষ্টেট জঙ্গি গোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করছেন। আবু বকর আল-বাগদাদী একজন ইরাকি। তিনি নিজেকে একজন নিষ্ঠুর এবং ধূর্ত সেনাপতি হিসেবে প্রমাণ করেছেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘তার পক্ষ হয়ে কাজ করতে তিনি বেশ কিছু দক্ষ লোককে নিয়োগ দিয়েছে। যারা দক্ষতার সাথে আক্রমণ পরিচালনা করতে সক্ষম এবং যারা অত্যন্ত সুঠামদেহের অধিকারী এমন লোকদের তিনি নিয়োগ দিয়েছেন। আমি বলতে চাচ্ছি, সাদ্দাম সেনাবাহিনীর সিনিয়র লেভেলের এক তৃতীয়াংশ  সাবেক কর্মকর্তা রয়েছে তার সাথে। প্রতিভা চিহ্নিত করতে এবং প্রতিভাবান মানুষকে প্ররোচিত করতে তিনি সত্যিই একজন দক্ষ।’

আল-বাগদাদী স্থানীয় এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে নিজেকে আমির ঘোষণা করেছেন এবং অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ ও সামগ্রিক লক্ষ্য অর্জনে ব্যাপক সংখ্যক সামরিক কমান্ডার নিযুক্ত করেছেন।

গারটেনস্টেইন রস বলেন, তবে শেষ পর্যন্ত এটি জঙ্গি গোষ্ঠীটির জন্য সবচেয়ে বড় দুর্বলতা বলে প্রমাণিত হতে পারে।

গারটেনস্টেইন রস বলেন, ‘এর মানে হল, খিলাফতের কার্যকারিতার উপর তাদের বৈধতা অনেকটা নির্ভর করছে। খিলাফত রক্ষার জন্য তারা সামরিক বাহিনীর সম্পদ অসামঞ্জস্যভাবে ব্যয় করবে। আরেকটি খুব বড় দুর্বলতা হল তাদের নিষ্ঠুরতা যা তারা ক্রমাগত করে যাচ্ছে।  তারা এখন জনগন কর্তৃক বেষ্টিত হচ্ছে। জনগন তাদের ঘৃণা করে এবং তাদের বধ করতে চান। প্রতিশোধ নেয়ার জন্য তারা বাইরে বের হয়ে আসছেন।’

 

কৌশলগত বিরতি

সাবেক সিআইএ অফিসার প্যাট্রিক স্কিনার বলেন, এ পর্যন্ত এটা লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, মার্কিন জোট ইসলামিক স্টেট কর্তৃক নতুন করে কোনো এলাকা সম্প্রসারণের প্রতিরোধক হিসেবে তাদের উপর বিমান হামলা চালাচ্ছে।

বলপ্রয়োগ আইএস প্রতিরোধের একটি কৌশলী প্রচেষ্টা হতে পারে।

স্কিনার বলেন, ‘আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করছি মারাত্মক রক্তপাত দমন করতে যাতে করে ইরাকি সরকার এবং তার আঞ্চলিক সহযোগীরা এর সমাধান করতে পারে।’

রানডস করপোরেশনের কনাবল বলেন, কিন্তু এ পর্যন্ত  ইসলামিক স্টেট সংগঠনটি প্রমাণ করেছে যে, তারা দ্রুতগতিতে কৌশল পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক শোষণ করতে পারদর্শী এবং তারা ইরাকের পাশাপাশি কুর্দি এবং তুরস্কের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভাজন ছড়াচ্ছে।

কনাবল বলেন, ‘আবু বকর আল-বাগদাদী সংগঠনটির একজন জনপ্রিয় নেতা হতে পারেন কিন্তু সেখানে একটি শক্তিশালী সামরিক কাউন্সিল এবং প্রতিষ্ঠানসমূহ রয়েছে। যারা অত্যন্ত স্থিতিস্থাপক।’

বিশেষজ্ঞরা একমত যে, ইরাকের নতুন সরকার হায়দার আল-আবাদির অধীনে সুন্নী জনগোষ্ঠীর অসন্তোষ দূর করতে না পারলে চলমান এই লড়াই সম্ভবত অব্যাহত থাকবে, এমনকি ইসলামিক স্টেটকে ইরাক হতে বিতাড়িত করা হলেও।

ভয়েস অব আমেরিকায় প্রকাশিত Islamic State Will Be Hard to Defeat শীর্ষক বিশ্লেষণের ভাষান্তর করেছেন মো. রাহুল আমীন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*