,

মুক্তিযোদ্ধা আবির

মোঃ আদিল মাহমুদ:

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ। সারা দেশে অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশে অধিকার রক্ষার আন্দোলন চলছে। তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা উত্তপ্ত। পাকিস্তানি সেনাদের অতিরিক্ত আনাগোনা ও তৎপরতা কিছু একটা জানান দিচ্ছে। সাধারণ মানুষ সবাই ভীত ও তটস্হ হয়ে নিজ নিজ ঘরে অবস্হান করছে। রাত আটটা বেজে গেছে। আবির এখনো বাসায় ফিরছে না! আবির ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ে বাংলায় অনার্স পড়ছে। গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুর। ফলে, ঢাকার খিলগাঁও খালার বাড়িতে থেকেই পড়া-শুনা করে। খালার বড় মেয়ে দিপা একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুবাদে ও খালাতো ভাই-বোন বিধায় তাদের মধ্যে ভালোবাসা গড়ে ওঠে। দিপা, আবিরের এক বৎসরের ছোট। সবে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজীতে অধ্যয়ন করছে।

সচরাচর আবির সন্ধ্যার আগেই বাসায় ফিরে। আজ রাত আটটা বেঁজে যাওয়ায় দিপা আবিরের জন্য খুব চিন্তা করছিলো। খালা আয়শা বিবিতো আরো বেশি চিন্তা করছে। কারণ, আবির তার ছোট বোন সায়লা বেগমের বড় ছেলে। তাছাড়া দু’বোনই জানে, আবির ও দিপার সম্পর্ক। তাই, দু’বোনই সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে, দেশের পরিস্থিতি একটু শান্ত হলেই তবে ঝাকঝমক ভাবে ওদের বিয়ে দেবে। আবির বা দিপার কাছে তখন কোনও মোবাইল ফোন ছিলো না। অতএব, ভাবনা ছাড়া দিপার আর কোনও ওপায় ছিলো না। আটটা থেকে এক সময় এগারটা বেঁজে গেলো কিন্তু আবিরের কোনও খবর পাওয়া যাচ্ছিল না!

এ দিকে বিভিন্ন জায়গা থেকে হরেক রকম খারাপ খবর আসতে লাগলো। আবিরের কথা ভেবে দিপা কান্না শুরু করে দিলো। মা, দিপাকে অনেক বুঝাতে লাগলো এ বলে যে, হয়তোবা আবির কোথাও আটকা পড়েছে, তাই দেরি হচ্ছে। কিন্তু না! দিপার মন তা বলছে না! কোনও অশুভ বিপদের সম্ভাবনা বার বার দিপার মাথায় ঘুরপাক খেতে শুরু করলো। ভালোবাসা, ভালোবাসাকে সব সময়ই বিপদের বার্তা পাঠায়, সরাসরি না হলেও অলৌকিক ভাবে। তাই হলো দিপার ভাবনায়। আবির আর ফিরে এলো না এবং আবিরের কোনও সংবাদও দিপা পেলো না।

আবার, ২৫ মার্চ ১৯৭১ এর রাত্রিতেই শুরু হলো বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত “অপারেশন সার্চলাইট”, যা সমগ্র পৃথিবীতে কলঙ্কিত একটা রাত্রি নামে পরিচিত। এ নিশিতে, যে ভয়াবহ গণহত্যা ঢাকা শহরে সংঘটিত হয়েছিলো তা পুরোবিশ্বে মালিন্য। মুক্তিযুদ্ধ আর ইতিহাসের গবেষক অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান ডয়চে ভেলেকে জানান, বাঙালির ওপর “অপারেশন সার্চলাইট” নামের ওই নিধন যজ্ঞের পরিকল্পনা শুরু হয়েছিলো একাত্তর সালের মার্চের শুরুতেই। এ ভয়ঙ্কর গণহত্যার ষড়যন্ত্রে যারা প্রধান অংশীদার, তারা হলেন। ১/ জুলফিকার আলী ভুট্টো ২/ জেনারেল ইয়াহিয়া ও ৩/ জেনারেল হামিদ। ২৫ মার্চ ইয়াহিয়া ঢাকা ত্যাগের পরই মধ্য রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, ঢাকায় পুলিশ, ই.পি.আর ও নিরীহ জনতার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

ঢাকায় তখনকার পুলিশ (ই.পি.আর) সদর দপ্তর, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস, মেডিক্যাল কলেজ ছাত্রাবাস ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বস্তি এলাকায় তাদের হত্যাযজ্ঞ চলে । এ বেপরোয়া অত্যাচার নিমিষেই ছড়িয়ে পাড়ে পুরোঢাকা শহরে। হানাদাররা লঙ্কা-কান্ড ঘটায় ঘুমন্ত মানুষের ওপর। সে রাত্রেই রাজারবাগ পুলিশ লাইন থেকে প্রতিরোধ শুরু হয়। ই.পি.আর সদস্যরা প্রতিঘাত করে শহীদ হন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাঙালি নিধনে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেছিলেন, পাকিস্তানি জেনারেল টিক্কা খান ও তাদের এ দেশের দোসর রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস ও শান্তি কমিটি।

পাকিস্তান সরকার, মুক্তিযুদ্ধ চলার সময় ১৯৭১ সালের ০৫ আগষ্ট একটা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যার শিরোনাম ছিল, “ক্রাইসিস ইন পাকিস্তান”। এতে একপক্ষীয় তথ্য পরিবেশন করা হলেও গণহত্যার ভয়াবহতা স্পষ্ট ছিলো। পাকিস্তানি সামরিক কমকর্তা, মেজর জেনারেল খাদিম রাজা, গুল হাসান খান, তাদের আত্মজীবনী মূলক গ্রন্থে, “অপারেশন সার্চ লাইটে”র কথা উল্লেখ করেছেন। খাদিম রাজার “স্ট্রেঞ্জার ইন ওন কান্ট্রি ”লেখাটা এ ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে, আবির শতো চেষ্টা করেও দিপার কাছে ফিরে আসার সুযোগ পায় নি। বন্ধুদের সাথে থেকে কোন রকমে প্রাণ বাঁচিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পালাতে সক্ষম হয়। শুধু, ছোট অল্পবয়সী একজন বন্ধুর কাছে একটা চিরকুট লেখে, পাঁচজন বন্ধুসহ শরিয়তপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। উদ্দেশ্য, সেখান থেকেই তারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলবে। চিরকুটে লেখা ছিলো, “আমার দিপা”,
“এখন আর ভালোবাসার সময় নেই। মাতৃভূমিকে রক্ষা করা ফরজ। আমি দেশ রক্ষার যুদ্ধে চললাম। নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করো। যদি দেশকে স্বাধীন করতে পারি এবং বেঁচে থাকি, তবে হয়তোবা ফিরে আসবো”!
ইতি,
“ছাত্রযোদ্ধা আবির”
২৬/০৩/১৯৭১ ইং

তিন দিন পর প্রকাশ নামে ১৫/১৬ বৎসরের একটা ছেলে দিপার কাছে চিঠিটা পৌঁছে দেয়। চিঠি পড়ে দিপার কান্না আর ধরে না। মা, প্রাণ-পণ চেষ্টা করেও দিপার কান্না বন্ধ করতে পারছিলো না। কিন্তু কি আর করা! এদিকে ঢাকা বিপদগ্রস্ত। দিপাকে নিয়ে মা, খুব চিন্তিত হয়ে পড়লো। উপযুক্ত মেয়ে, কখন আবার পাক-হানাদার বাহিনী এসে হাজির হয়। এ চিন্তা করে তারা নিজেদের বাড়ি মাদারীপুরে পালিয়ে যাওয়ার মনোস্হির করতে লাগলো। আবিরদের বাড়ি শরিয়তপুর আর ওদের বাড়ি মাদারীপুর। একদিন গভীর রাত্রিতে বাবা-মা ও মেয়ে নিজেদের জীবন ও সম্ভ্রম বাঁচানোর তাগিদে পায়ে হেঁটে মাদারীপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। তিন দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে আধাপেটে থেকে ওরা পাক-হানাদার ও তাদের দোসর রাজাকারদের চোখ ফাঁকি দিয়ে মাদারীপুরের নিজ বাড়িতে পৌঁছতে সক্ষম হয় । কিন্তু এখানে এসেও জানতে পারলো, সর্বত্র একই তান্ডবলীলা শুরু হয়ে গেছে। তাদের বাড়িটা ছিলো একটু গ্রামের দিকে তাই, কিছুটা স্বস্তি পেলেও হানাদার আতঙ্ক থেকে রক্ষা পাওয়া মুশকিল ছিলো!

বাবা-মায়ের ভীতি শুধু দিপাকে নিয়ে। কারণ, তারা জানে দিপা দেখতে সুন্দরী। যদি রাজাকারদের চোখে পড়ে যায় তবে আর রক্ষা থাকবে না! তাই নিয়ত কাজের মেয়ের মতো দিপাকে সাজিয়ে রাখতো। এভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে, আবার কখনো বা অন্যত্র অবস্থান করে, সময় পার করতে লাগলো। দিপা, আবিরের জন্য কান্না করতে করতে এমনিতেই ক্লান্ত হওয়ায়, চেহারায় অনেকটা কালো ছাপ পরিলক্ষিত হচ্ছিলো। বর্তমান প্রেক্ষপটে এ চেহারাই উত্তম ছিলো। কিন্তু বিভিন্ন ভাবে চেষ্টা করেও তারা আবিরের কোন সন্ধান করতে পারলো না। আবির বেঁচে আছে কিনা সেটাও এখন আর জানতে পারছেনা। কারণ, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর চার মাস অতিবাহিত হয়ে গেছে।

অপরদিকে, আবির তার পাঁচ বন্ধুসহ নিজ বাড়িতে পৌছে, মা-বাবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দেয়। আবিরের বাবা-মাও দেশ স্বাধীনের চেতনায় উদ্ভূদ্ধ ছিলেন বিধায়, সন্তানের মায়া ত্যাগ করে ছেলেকে মুক্তিযুদ্ধে পাঠিয়ে দেয়। আবির ও তার বন্ধুরা তখন মুক্তিযুদ্ধের দু’নম্বর সেক্টরে নাম লেখিয়ে ট্রেনিং করতে ভারত চলে যায়। দীর্ঘ একমাস ট্রেনিং সম্পন্ন করে তারা ফিরে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। বিভিন্ন অপারেশনে দক্ষতা দেখিয়ে আবির, বেশ নাম-ই ফোঁটাতে পেরেছিলো। অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারাও আবিরকে খুব পছন্দ করতো। প্রায় সময়ই আবিরের, বাবা-মা ও দিপার কথা ভীষণ মনে পড়তো! কিন্তু দিপারা এখন কোথায় কেমন আছে তার কিছুই আবির জানে না। শুধু বুঝে, ঢাকার অবস্থা ভালো না। ভাবে, হয়তোবা দেশের বাড়ি মাদারীপুরে চলে গেছে। তাই একদিন ভাবলো, যুদ্ধের ফাঁকে কোনও এক সময়, বাবা-মাকে দেখা ও মাদারীপুরে গিয়ে দিপার খবর নেয়া দরকার!

এ দিকে যুদ্ধ প্রায় শেষের দিকে। কারণ, বীর মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন জায়গায় পাক-হানাদার ও তাদের দোসরদের পরাজিত করে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আস্তে আস্তে ঢাকার দিকে ধাবিত হচ্ছিলো। নভেম্বর মাসের ০৭ তারিখ আবির, তার কমান্ডারের অনুমতি সাপেক্ষে এক মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুকে নিয়ে, বাবা-মার সাথে দেখা ও দিপাকে খোঁজার উদ্দেশ্যে প্রথমে শরিয়তপুর রওয়ানা করে। তখন আবির ফরিদপুরের যুদ্ধে নিয়োজিত ছিলো। খালি হাতেই ওরা রওনা করে। বিভিন্ন বিপদকে এড়িয়ে তারা ০৮ তারিখ রাত্রি বেলায় দু’বন্ধু শরিয়তপুর নিজ বাড়িতে পৌঁছে। গিয়ে দেখে দিপার বাবা-মাও ওদের বাড়িতে। আবিরকে দেখে তারা সবাই যেনও হতভম্ব হয়ে যায় এবং পরে কান্নাকাটি। নিজের বাবা-মাসহ, দিপার বাবা-মাও চিৎকার করতে শুরু করে। ওদের কান্না দেখে, আবির খুব ভয় পেয়ে যায়। শুধু বলে দিপা কোথায়?

বাবা বলতে থাকে, গত সেপ্টম্বর মাসের ১৩ তারিখে কতিপয় রাজাকার ও পাঞ্জাবি রাত্রি বেলায় এসে দিপাকে ধরে নিয় যায়। বহু খোঁজা খুঁজি করেও দিপাকে আর পাওয়া যায়নি! মাথায় বাজ পড়ার মতো কথা শুনে, আবির চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো। বন্ধু মুক্তিযাদ্ধা, আবিরকে শান্তনা দিতে লাগলো। আবির, দিপার আব্বাকে জড়িয়ে ধরে বললো, রাজাকাররা কারা ছিলো? কাউকে চিনতে পেরেছেন! দিপার বাবা কাঁদতে কাঁদতে বললো, রাজাকারদের সবার মুখ ঢাকা ছিলো, কাউকে চিনতে পারিনি। আমরা বাঁধা দেয়াতে, আমদেরকে নিয়ে একরুমে আটকে রেখে, দিপাকে নিয়ে চলে যায়। দিপার চিৎকার এখনো আমার কানে ভেসে আসছে, “বাবা আমাকে বাঁচাও”! তখনই আবির, সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বন্ধুকে নিয়ে বের হয়ে যায়।

বিবিধ পন্থায়, বিভিন্ন জায়গায় দিপার সন্ধান করে ব্যর্থ হয়ে নভেম্বরের ১৮ তারিখ ফরিদপুরের নিজ ক্যাম্পে এসে হাজির হয়। এবার শুরু হয় আবিরের ভয়ঙ্কর রূপ। একাধারে অনেক সংখ্যক পাক সেনা ও রাজাকারকে আবির নিজ হাতে গুলি করে হত্যা করে। বিজয়ের উল্লাস নিয়ে, দূরদূরান্ত থেকে মুক্তিযোদ্ধরা ঢাকার দিকে আসতে শুরু করেছে। আবিরের সহযোদ্ধারাও একসাথে ঢাকায় হাজির হয়। কারণ, আজ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। বাঙালি জাতির বিজয় দিবস। হাজার হাজার পাকিস্তানি সৈন্য আত্মসমর্পণ করে। বিভিন্ন অবস্থান থেকে অসহায় মেয়ে মানুষকেও উদ্ধার করা হয়। বিজয় উল্লাসের মধ্যে, অসহায় মেয়ে মানুষের মাঝে আবির খোঁজতে থাকে তার হারিয়ে যাওয়া দিপাকে।

এক সময় উদ্ধারকৃত অসহায় মেয়েদের মাঝে আবির তার আদরের দিপাকে খুঁজে পেয়ে জড়িয়ে ধরে। দিপা চিৎকার করে বলে আমাকে ধরো না! আমি যে, আমার সব হারিয়ে ফেলেছি। আবির চোখের পানি মুছতে মুছতে বলে, তুমি আমার ভালোবাসার দিপা। তুমি কিছুই হারাও নি। কারণ, তোমার সতীত্ব আর আমার ট্রেনিং এর বিনিময়ে আমরা বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছি। তাই, তুমি আমার চেয়েও বড় মুক্তিযোদ্ধা! বলেই দিপাকে আবার জড়িয়ে ধরলো। দু’জন অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করলো। অত:পর, দিপাকে নিয়ে নিজ বাড়ি ফিরে গিয়ে, ওই দিনই দিপাকে বিয়ে করলো। বাসর ঘরে শুধু আবির দিপাকে একটা কথাই বললো, “শুন দিপা, কখনো কোন দিনও ওই স্মৃতি মনে করবে না। মনে রেখো, যদি কিছু হারিয়ে থেকে থাকো তবে তা শুধুই তোমার আর আমার”। সুতরাং, আমরা আমাদের হারানো জিনিস ফিরে পেতে চাই না। এবার হাসো! দিপা আবিরকে জড়িয়ে ধরে খিল খিল করে হাসতে থাকলো।

লেখক পরিচিতি

ইন্সপেক্টর (তদন্ত)

পরশুরাম মডেল থানা ফেনী জেলা ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*