,

শাহবাগে ইসলামের দাওয়াত ও বিচক্ষণ রাজনীতি

শুদ ওজুদশ রহমাতাল লিল আলামীন

মসজিদে উ শুদ হামা রূয়ে যমীন

 

মুজাহিদ সগির আহমদ চৌধুরী:

শাহবাগ, সেই মুহাম্মদীদের জায়গা ছিল, মুসলিম মনীষাদের সাজদাগাহ ছিল, মুসলিম পুনর্জাগরণের পীঠস্থান ছিল। ছোট ভাইদের আল্লাহ তাআলা জাযায়ে খায়র দান করুন, দুনিয়া-আখিরাতে কামিয়াবি দান করুন। কাজের কাজ করেছেন একটি, আযান দিয়েছেন, দিয়েছেন ইকামত, নামাযের প্রথম জামায়াতটিও পুনঃপ্রচলন করে দিয়েছেন। এখন এই শাহবাগে দ্বিতীয়, তৃতীয়… অসংখ্য-অগুণিত জামায়াতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এটি গোটা ইসলামপন্থিদের ওপর দায়িত্ব বর্তায়। আহ্বান জানাই জমিয়তকে, নেজামকে, খেলাফতকে, মজলিসকে, এমনকি হেফাজতে ইসলামকেও; আসুন, শাহবাগে পুনঃপুনঃ জামায়াত আদায়ের ধারাবাহিকতা চালু করুন।

তার আগে সমগ্র ইসলামপন্থিদের কাছে একটি বিনীত অনুরোধ রাখবো, এজন্য সুলতানুল আরিফীন বায়েযীদ বোস্তামী (রহ.)-এর একটি ঘটনা এখানে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। তিনি সমাজ ও পরিবেশ বিনষ্টকারী এক দেহোপজীবিনীর আড্ডায় হানা দিয়েছিলেন, একেবারে খদ্দের হিসেবে। তাকে বললেন, টাকা তো আদায় করেছি, নির্দিষ্ট একটা সময় তুমি আমার কাছে বিক্রি হয়েছো, তাহলে এই সময়টায় আমিই যা করতে চাই বা তোমাকে করতে বলি তা তুমি করতে বাধ্য। হ্যাঁ, মেয়েটা বলল। সুলতান বললেন, যাও, পবিত্র হয়ে এসো, জায়নামাযে দাঁড়াও, নামায পড়। এরপর আরিফে বোস্তামী (রহ.) আল্লাহর দরবারে শাহীতে দু’হাত তুললেন, মাবুদ! তোমার বান্দীকে তোমার কেবলামুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছি, তাকে কবুল করে নাও, আমি আমার কাজ করেছি, হেদায়েত দানের দায়িত্ব তোমার।

লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে, হযরত বায়েযীদ (রহ.) মেয়েটার আড্ডায় পৌঁছে তাকে নিন্দা করেননি, বেশ্যা-মাগি-খানকি বলে গালি দেননি, তার ওপর হুদুদ কায়েম করতে উদ্যত হননি, তাকে অপবিত্র জ্ঞান করে ঘৃণা করেননি। আজকের শাহবাগ জায়গাটা ইসলামপন্থিদের কাছে একটা অপবিত্র, নিন্দিত, ঘৃণিত, নাস্তিক-মুরতাদদের জায়গা। ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্রআন্দোলনের নেতৃবৃন্দের বিচক্ষণোচিত বয়ান, বক্তব্য ও চরমপত্রে হযরত সুলতান বায়েযীদ বোস্তামী (রহ.)-এর দাওয়াতী কৌশল প্রতিফলিত হতে দেখে চমৎকৃত হয়েছি। তাঁরা শাহবাগে গিয়ে শাহবাগী, নাস্তিক, মুরতাদ ইত্যাদি গালাগালের অপরিণামদর্শী প্রদর্শনী না করে বিচক্ষণোচিত হেকমত অবলম্বন করেছেন মা শা আল্লাহ। আগামীতে শাহবাগগামী আগ্রহী সমগ্র ইসলামপন্থিদের উদ্দেশ্যে এটিই আমার অনুরোধ, বিচক্ষণোচিত এই হেকমত অবলম্বনের।

ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্রআন্দোলনের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, রুহানিয়ত ও জিহাদের সমন্বিত প্রয়াস। রাজনীতিতে রুহানি বা সুফিবাদী কৌশল প্রয়োগের যে উত্তরাধিকার ছাত্রআন্দোলন পেয়েছে সেটি চরমোনাইয়ের ঐতিহাসিক ময়দানের বরকতের ফল। এটি চরমোনাইয়ের মরহুম কালো মানিক খ্যাত শায়খের সাথে সান্নিধ্যে বা সুহবতে সালেহের ফল। এটি ‍সুফিবাদ বা সুফি তরীকার সাথে রাজনীতিক কর্মসূচির সমন্বয়ের ফল। সুলতানুল আরিফীন হযরত বায়েযীদ বোস্তামী (রহ.)-কে একশ্রেণির ধর্মব্যবসায়ী যিন্দীক বানিয়ে ফেলে, তথাকথিত এসব সহীহবাদীরা আরিফে বায়েযীদ (রহ.)-কে তাঁর প্রতি আরোপিত একটা কথা মা আ’যামা শানুহ (তিনি কতোই না মহান) দিয়ে তাঁকে যিন্দীক সাব্যস্ত করতে চায়। অথচ কথাটা সুলতানের বলে অকাট্য নয়, বুঝি না এ কেমন সহীহবাদিতা! এরা চরমোনাইকে নিয়েও অনেক বির্তক করে বা সুফিবাদকে সম্পূর্ণ খারিজ করার অপচেষ্টা চালায়। কিন্তু সুফিপ্রথার আবেদন যে কতোটা শক্তিশালী, কতোটা হৃদয়গ্রাহী, মানুষের মনোজগতকে নিয়ন্ত্রণকারী আজকের ছাত্রআন্দোলনের এই কর্মসূচিতে তার কিছু চমৎকারিত্ব দেখতে পাওয়া গেছে।

এক তীর্যক সমালোচক হেসে হেসে বলল, তাদের সাথে প্রশাসনের সমঝোতা আছে, সরকারি শর্ত ও বিধি মেনে এবং নিরাপত্তার শতভাগ নিশ্চয়তা পাওয়ার পরই তারা কর্মসূচি আয়োজন করেছে। হ্যাঁ, তা-ই মেনে নিলাম, কিন্তু আমার ভালো লাগার বিষয়টি হচ্ছে, এই আয়োজনে উগ্র সেক্যুলার অঙ্গনে কলিজায় যে আগুন লেগেছে, এদের কলজে পোড়ার যে গন্ধ আমি নাকে অনুভব করছি তাতে সারা শরীরে আনন্দ খেলছে আমার।

ছাত্রআন্দোলন একটি জিনিস প্রতিষ্ঠা করেছে, সেক্যুলারদের ফ্যাসিবাদ আর চলবে না। ঢাবিতে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি চলবে না এই ফ্যাসিবাদের মূলে কুটেরাঘাত করেছে ছাত্রআন্দোলন। শাহবাগে শুধু উলুধ্বনিই ধ্বনিত হবে, নর্তন-কুর্দনই শুধু হবে; তা হবে তা হবে না। এই শাহবাগে আমাদেরও অধিকার আছে, কর্মসূচি পালনের, বিশ্বাস অনুযায়ী জামায়াতে নামায আদায়ের। যদি মনে করেন, এসব কাজে সরকার ছাত্রআন্দোলনকে সহযোগিতা করছে তাহলে এমন সমালোচকরা মূর্খতাবশত সরকারকে ইতিবাচকভাবে মেনে নিচ্ছে, সরকারকে অজ্ঞাতবশত ভালো কাজের সহযোগী বানিয়ে দিচ্ছে।

ছাত্রআন্দোলন ‘যিনা-ব্যাভিচার’-কে সামনে এনেছে। তাও শাহবাগে দাঁড়িয়ে, যে শাহবাগে এই কয়দিন আগেও তথাকথিত ধর্ষকবিরোধীদের বেশ মেলা বসেছিল। এই ধর্ষকবিরোধীরা আবার একই সঙ্গে যিনা-ব্যাভিচারের সমর্থক, গোড়াই তারা এই যিনা-ব্যাভিচারকে সাধারণীকরণ করে, সমাজে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ করে। ছাত্রআন্দোলনকে ধন্যবাদ জানাই, তারা এই যিনা-ব্যাভিচারকে ধর্ষণের মতো অপরাধের মূলে নিয়ে এসে উপস্থাপন করেছে।

আমার মতে, পর্দার সাথে ধর্ষন সংঘটন-অসংঘটনের কোনো সম্পর্ক নেই। পর্দা ধর্ষণ টেকিয়ে দেওয়ার মহৌষুধ নয়। পর্দা হচ্ছে, আল্লাহ তাআলা কর্তৃক তার বান্দাদের জন্য পছন্দকৃত একটি বিধান। এটি ইবাদত, পবিত্রতা, শালীনতা, মর্যাদা ও খোদাভীরুতার নাম। এটি শুধু নারীদের জন্য ফরয নয়, এটি পুরুষদের জন্যও সমান ফরয। আর পর্দা পোশাকেরও, নজরেরও, অন্তরেরও। অন্তরে খোদাভীরুতা নেই বলে এবং নজরে পর্দা নেই মাদরাসার হুযুররাও ধর্ষণ করে এবং পর্দানশীন মাদরাসা ছাত্রীরাও ধর্ষণের শিকার হয়।

কাজেই পর্দা থাকলেও ধর্ষণ সংঘটিত হয়, হতে পারে, কিন্তু যিনা-ব্যাভিচার হয় না, হবে না। যে খোদাভীরু, যার চরিত্র ভালো, নজর পরিচ্ছন্ন, অন্তর পরিষ্কার, কুমতলব নেই, তাদের পক্ষে যিনা-ব্যাভিচারে লিপ্ত হওয়া সম্ভব নয়। কাজেই উগ্র সেকুলাররা পর্দা বললেই তেড়ে আসার কারণ হচ্ছে, যিনা-ব্যাভিচার বন্ধ হয়ে যাবে সেজন্য।

এদের তথাকথিত ধর্ষনবিরোধীবাদিতাও একটা ভাওতা। কারণ এদের অঙ্গনে যিনা-ব্যাভিচার এতো সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে যে, সেখানে জোর বলতে কিছুই নেই, কাজেই তাদের কোনো কাজই ধর্ষণ নয়। ধর্ষণের প্রশ্নটা সেখানেই ওঠে যেখানে এখনও কিছুটা হলেও নৈতিকতার বালাই আছে। যদি সেই নৈতিকতাও ওঠে যায় তাহলে ধর্ষণ বলতেই কিছু থাকে না। এদের ধর্ষণের বিরোধিতার আসল উদ্দেশ্য কিন্তু এটাই। এরা ধর্ষণর বিরোধিতা আসলে করে না, বরং যিনা-ব্যাভিচারকে এতো নমরালে পরিণত করতে চায় যে, যাতে সেটা আর ধর্ষণের পর্যায়ে না থেকে শুধুই মধুমিলনে পর্যবসিত হয়। মিলন হবে কিন্তু উহ-আহ হবে না। জোর-জবরদস্তি হবে না, সম্মতিক্রমেই হবে সব, সবাই সম্মতি দেবে, স্বেচ্ছায় সবাই সম্মত হবে। পরিবেশটা সেই পর্যায়ে পরিণত করতে চায় এরা, এটাই উগ্র সেক্যুলারদের মূল উদ্দেশ্যে।

লেখক : মুজাহিদ সগির আহমদ চৌধুরী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদক

মাসিক আততাওহীদ।

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*