,

ওসি প্রদীপের আশির্বদা! দফাদার আমিন এখন কোটিপতি

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥

সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা হত্যা মামলার আসামি প্রদীপের পক্ষে চাঁদা আদায়কারী একাধিক গ্রামপুলিশ কোটিপতি বনে গেছে। ইয়াবা কারবারি হোক বা না হোক, সাবেক ওসি প্রদীপের নামে তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করত ওইসব গ্রামপুলিশ। টাকা আদায়ে ব্যর্থ হলে ইয়াবা, অস্ত্র ও হত্যা মামলায় জড়িয়ে দেয়া হতো নিরীহ ব্যক্তিদের।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সাবেক ওসি প্রদীপ দাশ মামলার ভয় দেখিয়ে বিভিন্নজনের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করতেন। আবার কিছু ইয়াবা কারবারির কাছ থেকে মাসিকচুক্তিতে চাঁদাও নিতেন। তার এসব টাকা তুলত বিভিন্ন এলাকার চৌকিদার-দফাদার। যারা টাকা দিতে গড়িমসি করত, চৌকিদার দফাদারকে সাক্ষী রেখে তাদের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিত প্রদীপ। ক্ষমতার অপব্যবহারে টাকা আদায়কারী একাধিক চৌকিদার ও দফাদার অঢেল সম্পদ, দালানকোটা ও কোটি টাকার মালিক বনে গেছে। মেজর সিনহাকে গুলি করার ওই রাতে (৩১ জুলাই) টার্গেটমতো টাকা না দেয়ায় সেন্টমার্টিন দ্বীপের চার জনপ্রতিনিধিকে কথিত ইয়াবা উদ্ধার মামলায় আসামির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এদিকে বৈধভাবে উনচিপ্রাং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিভিন্ন এনজিও’র অধীনে ঠিকাদারি কাজ এবং মৎস্য ঘের করে টাকাকড়ির মালিক বনে গেছে দেখে স্থানীয় নুরুল আমিন চৌধুরীর পুত্র ও শ্রমিকলীগ নেতা খলিল আহমদ চৌধুরীকে টার্গেট করে স্থানীয় দফাদার আমিনুল হক ও তৎকালীন ওসি প্রদীপ দাশ। ঠিকাদার খলিলের কাছে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করা হয়। নতুবা ক্রসফায়ার ঘটনায় ইয়াবা ও অস্ত্র মামলার আসামি করা হবে বলে হুমকি দেয়া হয়। ওই সময় খলিল চৌধুরী বিষয়টি স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের অবহিত করেন। তবে ওসি প্রদীপের আতঙ্কে টার্গেটে পরিণত হওয়ার ভয়ে সমাজপতিদের কেউ কেউ ঘর থেকে বের হতেন না। গত ৭ জুলাই হোয়াইক্যং কম্বনিয়া বড়ছড়া এলাকার খালের পাড়ে স্থানীয় সাদ্দাম হোসেন ও আবদুল জলিল নামে দুই মাদক কারবারি পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। এ ঘটনায় স্থানীয় চৌকিদার দেলোয়ার হোসাইন ও দফাদার আমিনুল হককে সাক্ষী দেখিয়ে শ্রমিকলীগ নেতা খলিলসহ ২৫ জনকে পলাতক আসামি করা হয়েছে। ওই গ্রামের সমাজপতিরা বলেন, মাদক ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত নেই এমন ব্যক্তিদেরও পলাতক আসামির তালিকায় নাম দিয়ে লাখ লাখ টাকার বাণিজ্য করেছে সাবেক ওসি প্রদীপ দাশ। তার টাকা উসুলকারী হোয়াইক্যং, হ্নীলা ও সাবরাং ইউনিয়নের কতিপয় গ্রামপুলিশও বহু সম্পদের মালিক।

জানা যায়, মাদক কারবারি সাদ্দাম হোসেন ও আবদুল জলিল পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলে ওই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল দাবি করে হোয়াইক্যং ফাঁড়ির এএসআই আরিফুর রহমান বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন টেকনাফ থানায়। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন ওসির নির্দেশে ৭ জুলাই টেকনাফ থানায় রুজু হওয়া মামলায় দফাদার আমিনুল হকের(প্রকাশ নুরুল আমিন) কথামতে স্থানীয় ২৫ ব্যক্তিকে আসামি করেন প্রদীপ দাশ। হত্যা মামলায় সাবেক ওসি প্রদীপ দাশসহ সাত পুলিশ কারাগারে যাবার পর উনচিপ্রাং এলাকার ঠিকাদার খলিল চৌধুরী জানতে পারেন যে, তাকে কথিত বন্দুকযুদ্ধ মামলায় আসামি করা হয়েছে। তিনি এই মিথ্যা মামলা থেকে রেহাই পেতে পুলিশের উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানিয়েছেন।

স্থানীয়রা বলেন, দফাদার হিসেবে নিয়োগ পাবার মাত্র বছর তিনেকের মধ্যে দফাদার আমিনুল তৎকালীন ওসি প্রদীপের দোহাই দিয়ে ক্রসফায়ারের ভীতি বাণিজ্য করে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছে। হোয়াইক্যং এলাকায় গড়ে তুলেছেন সুরম্য অট্টালিকা। সেখানে পৃথক গড়েছেন বিশাল মার্কেটও। মুঠোফোনে একাধিক কল করেও দফাদার আমিনুল হক রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেয়া যায়নি। তবে কথিত বন্দুকযুদ্ধ মামলার ২৫ পলাতক আসামি কারা তিনি জানেন না দাবি করে চৌকিদার দেলোয়ার হোসেন বলেন, মামলার আইও আমাকে দস্তখত করতে বলায় আমি সাক্ষী হয়েছি। শুনেছি স্থানীয় অনেকে ওই মামলায় পলাতক আসামি হয়েছে। সাবেক ওসি প্রদীপের জন্যও টাকা উসুলের কথাও সত্য নয় বলে দাবি করেন তিনি।

টেকনাফ মডেল থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশের ক্রসফায়ার বাণিজ্য ও মধ্যযুগীয় নির্যাতনে অন্তত আড়াই বছর ধরে সীমান্তের মানুষ যখন ভয় ও আতঙ্কে জীবন পার করছে, ঠিক ওই সময় সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে হোয়াইক্যং ইউনিয়নের দফাদার আমিনুল হক (প্রকাশ নুরুল আমিন) মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। টেকনাফের কিছু চৌকিদার ও দফাদার ওসি প্রদীপের সোর্স বনে যায়। তৎকালীন ওসির দাপট দেখিয়ে দফাদার আমিনুল হক( প্রকাশ নুরুল আমিন) হোয়াইক্যং ইউনিয়নে গড়ে তোলে রামরাজত্ব। সে প্রকৃত মাদক কারবারিদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা উত্তোলন করত। নিরীহ মানুষের কাছ থেকে তার চাহিদামতো টাকা না পেলে ক্রসফায়ার মামলার আসামি করে দিত। ওই দফাদারের ইশারায় প্রদীপ কুমার দাশ হোয়াইক্যংয়ের বহু নিরীহ মানুষকে হত্যা ও হয়রানি করেছিল। সাবেক ওসির নামে দফাদার নুরুল আমিন হোয়াইক্যং নয়াপাড়া বটতলীর মোঃ খাইছারের কাছ থেকে ছয় লাখ টাকা, ফেরদৌসের কাছ থেকে চার লাখ, মাইন উদ্দিনের কাছ থেকে চার লাখ, খারাংখালির ইউপি সদস্য জাহেদ হোসেনের কাছ থেকে এক লাখ ৪০ হাজার টাকা, সামসুল আমিনের কাছ থেকে ৬০ হাজার টাকা, নয়াবাজারের মোঃ আলম বাবুলের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা, খারাংখালি পূর্ব মহেশখালিয়া পাড়ার শাহ আলমের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা, নুর মোহাম্মদের কাছ থেকে তিন লাখ ৫০ হাজার টাক মোঃ রফিকের কাছ থেকে তিন লাখ ২০ হাজার, নয়াবাজার সাতঘরিয়া পাড়ার হাবিবউল্লাহর কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

হোয়াইক্যং এলাকার স্থানীয় অনেকেই তার বিষয়ে জানান, ওসি প্রদীপ কুমার দাশের ক্ষমতা ও ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে এলাকার নিরীহ মানুষকে জিম্মি করে রেখেছিল দফাদার আমিন। প্রকৃত মাদক কারবারিদের আড়াল করে নিরীহ মানুষকে হয়রানি করেছে।

Cw

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*