,

মানুষের বাস্তব জীবনের চরিত্র অবলম্বনে “প্রকৃত মানুষ”

মানুষের বাস্তব জীবনের  চরিত্র  অবলম্বনে: প্রকৃত মানুষ :

মোঃ আদিল মাহমুদ :

আপনি বিদ্বান, জ্ঞানী, বিজ্ঞ, অভিজ্ঞ, পন্ডিত যাই হউন না কেন তার অর্থ এই নয় যে, আপনি প্রকৃত মানুষ! প্রকৃত মানুষ হতে হলে আপনাকে অবশ্যই মানুষের কল্যানে আসতে হবে। আপনি অতি শিক্ষিত, মহাগুরু, জননেতা হতে পারেন, কিন্তু যখনই কোন মানুষ আপনার অবহেলার কারনে বা আপনার নিরবিচ্ছিন্নতার জন্য কষ্ট পাবে, অসহায়ত্ব বরন করবে, ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হবে কিন্তু আপনার পক্ষে করনীয় থেকে বা আপনার সার্মথ্য থেকেও আপনি দায়িত্বে অবহেলা করছেন তো আপনি আর প্রকৃত মানুষ বা উৎকৃষ্ট মানুষের কাতারে থাকতে পারবেন না, পারা ন্যায় সঙ্গতও হবে না।

আমরা মানুষকে তার সৌর্ন্দয্য, বেশভূষা, শিক্ষা, দীক্ষা, ক্ষমতা, দক্ষতাকে দেখে মূল্যায়ন করি। পদমর্যাদা অনুযায়ী সম্মান করি, সালাম দেই কিন্তু একবারও আমরা এই সম্মান দেখানোর ক্ষেত্রে সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি মানুষের কথা ভাবিনা। ভাবি শুধু পৃথিবীর প্রচলিত অবস্থা ও নিয়মতন্ত্র থেকে যুগ যুগ ধরে চলে আসা অনিয়মতান্ত্রিক প্রথা যা অনেক জ্ঞানী জনেরাই শ্রদ্ধার সাথে দেখে থাকেন।

 

গ্রীক দার্শনিক এ্যারিস্টটল বলেছিলেন, মানুষ হলো বুদ্ধিবৃত্তি সম্পন্ন জীব। এই সজ্ঞাটি আজও ব্যাপক ভাবে সমাদৃত। তবে সৃষ্টির আলোকে চিন্তা করলে এর সত্যতা পাওয়া বড়ই মুষ্কিল। মানুষ সম্পর্কে অনেক কিছুই অনেকে জানে যেমন, মানুষ, মনুজ, মনুষ্য, আদম, আদমি, ইনসান, মানব, মানুখ, লোক,হোমো ইত্যাদি। কিন্তু প্রকৃত মানুষ সম্পর্কে জানতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে বৃদ্ধিবৃত্তি কি? সন্মানিত দার্শনিক এ্যারিস্টটল বৃদ্ধিবৃত্তি সম্পন্ন জীবের সাথে মানুষের তুলনা করেছেন। তাহলে কি যার বৃদ্ধিবৃত্তি নেই যেমন ধরুন মস্তিস্ক বিকৃত লোক, যার কোন বুদ্ধিবৃত্তিই নেই তবে কি সে স্রস্টার সৃষ্টি রক্তে মাংশে গড়া মানুষ নয়! আবার যার বুদ্ধিবৃত্তি আছে বা বেশী-ই আছে তবে কি সে-ই মানুষ? যেমন, যে বিজ্ঞানী পারমানবিক বোমা, ক্ষেপনাস্ত্র ইত্যাদি তৈরী করছে তারাই শুধু মানুষ! না, কখনোই নয়, মানুষ হতে হলে পূর্বের সমস্ত ধ্যান ধারনা বাদ দিয়ে নতুন করে কথা বলতে হবে।

তাই বর্তমান যুগে মানুষ বলতে বুঝতে হবে বুদ্ধিবৃত্তি সম্পন্ন জীব ও উক্ত বুদ্ধিবৃত্তি, অবশ্যই সৃষ্টির কল্যানে নিয়োজিত হতে হবে, অকল্যানে নয়। যদি দার্শনিক এ্যারিস্টটলের মতবাদ সত্য হয়, তবে বুঝতে হবে, বর্তমান বিশ্বে যারা মানুষের অকল্যানে নিয়োজিত আছে তারাই শুধু মানুষ এবং যারা অকল্যান থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে তারা অমানুষ। এখানে একটি উদাহরণ খুবই জরুরী। ধরুন হঠাৎ করে ভিনগ্রহ থেকে কোন বুদ্ধিবৃত্তি সম্পন্ন জীব পৃথিবীতে এসে তাদের অতি আধুনিক বুদ্ধিমত্তার কারনে পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে অর্থাৎ রক্তে মাংশে গড়া মানুষকে মেরে ফেললো তবে কি তারা মানুষ? আবার ধরুন কোন বুদ্ধিবৃত্তি সম্পন্ন জীব ভিনগ্রহ থেকে এসে, পৃথিবীর মানুষের দুঃখ দূর্দশা দেখে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের রোগ ব্যাধি নিরাময়, জীবন যাত্রার মান উন্নয়ন করে দিল, নাকি তারা মানুষ! আপনি ভাল করে ভেবে দেখুনতো আসলেই এদের এ দু’য়ের মধ্যে কারা মানুষ! যদি ভাবেন, যারা মানবজাতির কল্যানে এসেছে তারা মানুষ তবে আপনাকে মানতে হবে যে, বর্তমান বিশ্বে যারা পৃথিবী ও সৃষ্টির অকল্যান করছে তারা কেহ-ই মানুষ নন!

 

জলের যেমন অপর নাম আছে অর্থাৎ জীবন, তেমনি মানুষের অপর নাম হচ্ছে বিতর্কিত মানুষ। অর্থাৎ শুধু জল খেলেই মানুষ বাঁচতে পারে না, তাই জলের অপর নাম জীবন হলেও তা পরোপুরি জীবনের মধ্যে পড়ে না। ফলে জীবনের অপর নাম শুধু জল নয়! তেমন মানুষও বিতর্কিত। আসল মানুষ বা প্রকৃত মানুষ হচ্ছে তার জ্ঞান এবং ঐ জ্ঞান হতে হবে মানুষের কল্যানের স্বার্থে। পোষাক হচ্ছে মানুষের বাহিরের আবরণ। তাই বিশ্বখ্যাত গ্রীক দার্শনিক “সক্রেটিস” বলে ছিলেন “ অপরীক্ষিত জীবন নিয়ে বেঁচে থাকা গ্লানিকর” অর্থাৎ জীবনকে বা মানুষকে অবশ্যই পরীক্ষিত হতে হবে। মানুষের মধ্যে থেকে যাচাই বাচাই করে প্রকৃত মানুষকে খোঁজে বের করে সমাজের উচ্চস্তরে বসাতে হবে এবং দিক নির্দেশনা তাদের কাছ থেকেই আসতে হবে। তবেই, পৃথিবীতে শান্তি ফিরে আসার সমূহ সম্ভাবনা থাকবে।

 

আবার মানুষের ভাষাও, জ্ঞান অর্জনের একটি প্রধান উপকরন। আগেই বলেছি সেই জ্ঞান হতে হবে মানুষের কল্যানে। নিউক্যামেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ম্যাগিটলারম্যান বলেছেন “ পৃথিবীতে মানুষ হলো একমাত্র প্রাণী যাদের ভাষা আছে, এই ভাষার কারনে আমরা অন্যসব প্রাণী থেকে আলাদা হয়েছি”। কিন্তু আমার কথা হলো অন্য কোন প্রাণীর ভাষা নেই তা তিনি জানলেন কি করে। যেমন ধরুন, আমরা একই পৃথিবীর মানুষ হয়েও তো অনেকের কথা- বলা দেখে বেকুবের মতো হা করে তাকিয়ে থাকি। কারণ, ঐ ভাষা সম্পর্কে আমাদের কোন জ্ঞান নেই। আমরা একই দলভুক্ত, একই সৃষ্টি, একই জ্ঞানে শিক্ষিত হয়েও যদি এক ভাই আরেক ভাইয়ের ভাষা বুঝতে না পারি তবে অন্য প্রাণীর ভাষা সম্পর্কে আমাদেরতো ধারনাই থাকার কথা নয়! এমনও তো হতে পারে অন্য প্রাণীদের কারো কারোর মধ্যে ভাষার প্রচলন আছে যা আমরা জানিনা বা আমাদের অপরিপক্ক জ্ঞানে তা বের করা সম্ভব হচ্ছে না।

 

আবার কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মানব বির্বতন বিভাগের শিক্ষক ও নৃজ্ঞিানী রবাট ফোলি বলেছেন, “জটিল যতো বিষয় আছে তার একটি ভাষা এবং এটিই মানুষ বানিয়েছে”। ওনার কথাই যদি ধরি তবে দেখা যায় যে, হাজার বছর আগেও মানুষের জটিল বিষয়ের উপর জ্ঞান ছিল। অর্থাৎ হাজার বছর আগেও অনেক জ্ঞানী ছিল কারন, ভাষাই সবচেয়ে জটিল, তবে ঐ জ্ঞানীদের মধ্যে অনেকে বনজঙ্গলে উলঙ্গ অবস্থায় থেকেও বিভিন্ন ভাষা ব্যবহার করতো, হয়তো বা ঐ ভাষা লিখিত ছিলনা। অলিখিত ভাষা ব্যবহার করেও হাজার বছর মানুষ কাটিয়েছে। তাহলে, মানুষ যেহেতু হাজার বছর আগেই এতো বড় জটিল বিষয়টি আবিস্কার করতে পেরেছিল তবে তারা উলঙ্গ কিংবা বর্বর ছিল কেন! আধুনিক জ্ঞান তারা আয়ত্ব করতে পারেনি কেন! আকাশে কিংবা সমুদ্রের নীচে ঘুরে বেড়ায়নি কেন?

 

আবার ভাষা যদি খুব জটিল বিষয়ই হতো তবে এই পৃথিবীতে এতো ভাষা কেন, যার অনেক নামই মানুষ জানে না! ভাষার সংখ্যা নিয়ে অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান গবেষণা করেছে, তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা এস,আই,এল অর্থাৎ সামার ইন্সটিটিউট অব লিঙ্গুইস্টিকস এর তথ্য মতে পৃথিবীতে ভাষার সংখ্যা ৬৯০৯ টি। অন্যদিকে, ভাষা যদি এতোই জটিল হতো তবে, পাপুয়া নিউগিনির মতো অল্প জনসংখ্যার দেশে ৮৩২ টি ভাষা থাকতো না! আসল কথা হচ্ছে মানব সভ্যতার পাশাপাশি ভাষারও বিবর্তন ঘটেছে। প্রখ্যাত ভাষা বিজ্ঞানী ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৯২৫ সাল প্রমাণ করেন যে, গৌড়ী ও মাগধী প্রাকৃত থেকে বাংলা ভাষার উৎপত্তি হ্য়েছে। আবার ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে তিনিই প্রথম উর্দুর পরিবর্তে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার যৌক্তিক দাবি জানান। তবে, হাজার হাজার ভাষার মধ্যে আমাদের মাতৃভাষা অনন্য, কারণ অন্য কোথাও ভাষার জন্য মরণপণ সংগ্রাম, লড়াই, আন্দোলন হয়নি, প্রান দিতে হয়নি। তাই, প্রিয় বাংলা ভাষা আমাদের গর্ব।

 

একটি উদাহরন দেই, যেমন মৌঁমাছি ও পিঁপড়ার কথাই ধরুন, তাদের যে ভাষা নেই তা আপনারা কি ভাবে বুঝলেন! তাদের ভাষা নেই এটা ভালভাবে বুঝলেন, কিন্তু ওদের যে ভাষা বা সাংকেতিক আদান প্রদান থাকতে পারে সেটা বুঝলেন না কেন? ভাষা হচ্ছে মনের ভাব প্রকাশের একটি মাধ্যম এটা সর্বজন স্বীকৃত। পিপঁড়া ও মৌঁমাছির জীবন যাপন পর্যালোচনা করলে স্পষ্টই বুঝা যায় যে, ওরা কোন না কোন মাধ্যম ব্যবহার করে থাকে যা হয়তো আমাদের সীমাবদ্ধ জ্ঞান দ্বারা উদঘাটন করা সম্ভবপর হয়ে উঠছে না। হয়তো এমন একদিন আসবে যখন মানুষ বুঝবে যে, মানুষই বোকা ছিল।

 

উপসংহারে বলতে চাই, মানুষ ও প্রকৃত মানুষ সম্পূর্ন আলাদা, আর ভাষা ছাড়া মানুষের অস্তিত্ব মানা কাল্পনিক। তাই মানুষের জ্ঞান ও ভাষা পদ্ধতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, আসলে মানুষের জ্ঞান খুবই সীমিত এবং ভাষা কোন জটিল বিষয়ই নয়। আবার, মানুষের যে জ্ঞান আছে তার বেশীর ভাগই জ্ঞানের পর্যায়ে পড়ে না এবং যে ভাষা মানুষ ব্যবহার করে তা প্রকৃতি থেকে ধীরে ধীরে বিবর্তনের মাধ্যমে এসেছে, কঠিন কোন কাজ নয়। তবে কবি, সাহিত্যিকরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে যুগ যুগ ধরে ভাষাকে সুন্দর ও মাধুর্য্যময় করে গড়ে তুলেছেন।গ্রীক প্রক্ষাত দার্শনিক সক্রেটিস, প্লেটোর কথাও আপনারা জানেন। দার্শনিক এরিস্টটল, প্লেটোর-ই ছাত্র ছিলেন। মানবজাতির কল্যানে দর্শনের ভুমিকা অপরিহার্য, আদিযুগে প্রায় সব কিছুই দর্শনের আওতা ভুক্ত ছিল। যদিও কালক্রমে তার পরিব্যপ্তি ঘটে, কিছু কিছু আলাদা হয়ে যায়। প্লেটোই পশ্চিমা বিশ্বে উচ্চ শিক্ষার জন্য প্রথম প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। আবার প্লেটো, মহান দার্শনিক সক্রেটিসের ছাত্র ছিলেন। এই তিনজন বিশ্ব বিখ্যাত দার্শনিক খ্রীষ্টপূর্ব (৪২৭- ৩৪৭) এর মধ্যে হবে বিশ্বে জ্ঞান চর্চার প্রভূত উন্নয়ন সাধন করেছিলেন, যারই ধারাবাহিকতার ফল আজকের উন্নত জ্ঞান ও প্রযুক্তি। কিন্তু তারা কি কখনো ভেবেছিলেন, যেই উচ্চ শিক্ষার জন্য তারা আজ মরিয়া হয়ে উঠেছে, সেই শিক্ষাই একদিন মানুষের অকল্যানে নিয়োজিত হবে!

 

প্রকৃত মানুষ হতে হলে প্রথমে তার অর্ন্তনিহিত মানুষটাকে জাগ্রত করতে হবে। বর্তমান বিশ্বে মানুষ বলে খ্যাত মানুষরা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে, ফলে তারা তাদের স্বার্থান্বেসী চিন্তা ভাবনার জন্য মানুষের প্রকৃত রূপ থেকে ক্রমেই বিছিন্ন হয়ে পড়েছেন। ক্রোধ, হিংসা, বিদ্বেষ, ধর্ষন, লুন্ঠন, মারামারি, খুনাখুনি, চুরি, ডাকাতি, প্রতারনা, জালিয়াতী, অন্যায়, অত্যাচার, বিশ্বাসঘাতকতা, দুর্বলের উপর অন্যায় আচরণ, অনিরপেক্ষতা ইত্যাদি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এখানে কবির কথা প্রাসঙ্গিক, স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, “জীবে প্রেম করে সেই জন, যেইজন সেবিছে ইশ্বর”। অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তার প্রতিটি সৃষ্টিকে রক্ষা করা, সম্মান করা ও বিপদের হাত থেকে বাচাঁনোই প্রকৃত মানুষের কাজ। তাই আমার মতে বর্তমান বিশ্বে মানুষ ০৩ (তিন) প্রকার যথা- ১। প্রকৃত মানুষ, ২। এরিস্টটলের মানুষ ও ৩। ক্ষতিকর মানুষ। ক্ষতিকর মানুষ ততারাই যারা মানুষের পর্যায়েই পড়ে না। এই মানুষ সেই সকল ব্যক্তি যারা নিয়ত পৃথিবীতে মানুষের অকল্যানে নিয়োজিত থাকে, যাদের মনুষ্যত্ব বলতে কিছু থাকে না। তাই, সৃষ্টির কল্যাণে প্রকৃত মানুষদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে, না হয় আমাদের এই প্রিয় বসুধা চির দিনের জন্য হারিয়ে যাবে। তাই, চলুন ধরা’কে রক্ষা করি, মানুষকে বাঁচিয়ে তুলি, সচেতন হয়ে ঐক্যবদ্ধ ভাবে ভাইরাসের মোকাবেলা করি।

লেখক পরিচিতি- পুলিশ ইন্সপেক্টর (তদন্ত) 

পরশুরাম মডেল থানা, ফেনী জেলা ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*