,

“সিলেটগামী জয়ন্তীকা এক্সপ্রেস ট্রেন”

“সিলেটগামী জয়ন্তীকা এক্সপ্রেস ট্রেন”

মোঃ আদিল মাহমুদ:

ভালবাসা স্বর্গীয় ও পবিত্র, এই কথাটি অনস্বীকার্য্য। অপবিত্রতা ও প্রতারনা যখন হাজির হয় তখন আর সেটা ভালবাসা থাকে না। মানুষের জীবনে হাজারো ঘটনা ঘটে যায় দিনের পর দিন। তার কোনটি ভালবাসা, আবার হয়তো কোনটা তামাসা। জীবন মহামূল্যবান কিন্তু অতি ক্ষুদ্র, তারপরেও, প্রতিনিয়ত মানুষের জীবনে দুঃখ, কষ্ট, আনন্দ, মায়া মমতা, ভালবাসা নিয়ে যা ঘটছে সেই সব নিয়েই প্রতিটি মানুষ ইচ্ছে করলে দৈনিক একটি ছোট গল্প লিখতে পারে। তবে অনেকে লাজ-লজ্জ্বার ভয়ে, আবার কেউ বা সময়ের অভাবে, আবার কেউ বা অপারগতার কারনে এই সব লিখা থেকে বিরত থাকে। কিন্তু তার পরেও কেউ কেউ তাদের ভালবাসাকে মানুষের সামনে ছোট আকারে তুলে ধরার চেষ্টা করে। আর তারই ধারাবাহিকতায় আমিও কিছু স্মৃতি তুলে ধরার চেষ্টা করছি লেখনীর মাধ্যমে যার সারমর্ম বন্ধুকে নিয়ে।

 

আজ এই লিখার সময় কবি গুরু রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা মনে পড়ে। তিনি লিখেছিলেন, “ছোট প্রাণ, ছোট ব্যাথা, ছোট ছোট দুঃখ কথা।

নিতান্তই সহজ সরল,

সহস্র বিস্রিত রাশি প্রত্যহ যেতেছে ভাসি,

তারই দু’চারিটি অশ্রুজল,

নাহি বর্ণনার ছটা, ঘটনার ঘনঘটা,

নাহি তথ্য নাহি উপদেশ, অন্তরে অতৃপ্ত রবে,

সাঙ্গ করি মনে হবে,

শেষ হয়েও হইল না শেষ।

 

১৯৯০/৯১ সাল, বিকাল তিনটার জয়ন্তীকা এক্সপ্রেস ট্রেনের শোভন শ্রেনীতে উঠে বসলাম। সঙ্গে ছিল আমার বড় ভাই। ভাইয়া সিলেটে জালালাবাদ গ্যাসের ডি.জি.এম ছিলেন বর্তমানে কানাডায় স্বপরিবারে বসবাস করেন। ট্রেন আস্তে আস্তে কমলাপুর রেলওয়ে জংশন থেকে যাত্রা শুরু করলো। ভাবীর প্রথম সন্তান হবে তাই ভাই আমাকে নিতে ঢাকায় এসেছিল। আমি তখন রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স পড়ছি। আমার ও যেতে ইচ্ছে করছিল। সাথে ছিল আমার বড় বোনের লেখা অনেকগুলো কবিতার বই যা সিলেটে ভাইয়া বিভিন্ন বইয়ের দোকানে দিবে এই জন্য নেয়া।

 

ট্রেনে আমি আরো অনেক বার চড়েছি, কিন্তু এবারের ট্রেন যাত্রা মাত্র আট ঘন্টার জন্য আমার কাছে মধুময় হলেও পরবর্তীতে আর মধুময় ছিল না। এখনো যখন ট্রেনে কোথাও যাই, আমাকে ঐদিনের কথা স্মরন করিয়ে দেয়। ট্রেন যেদিকে চলছিল, সেদিকে মুখ করেই আমি ও আমার ভাইয় বসা ছিলাম, বক্স আকৃতির সীট, আমাদের সামনেই দুই ভদ্রলোক আমাদের দিকে মুখ করে বসে আছে।ট্রেন চলছেতো চলছেই, হঠাৎ চোখ পড়লো বাম দিকের বক্সে বাসা ১৮/১৯ বৎসর বয়স হবে এমন একটি মেয়ের দিকে। আমি তাকাতেই মেয়েটি আমার দিক তেকে দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিল। প্রায় আধঘন্টা হয়েছে ট্রেন ছেড়েছে অথচ আমর চোখ একবারের জন্যও মেয়েটিকে দেখল না! নিজেই অবাক হলাম, আমিতো এতো আত্মভোলা নই যে, এমন সুন্দর, হালকা পাতলা গড়ন, মার্জিত একটি সুন্দরী মেয়েকে দেখতে পাবো না। আমি অপদার্থ, আবার একটু লাজুক স্বভাবের ছিলাম। চিঠি লিখতে বেশ পটু ছিলাম কিন্তু কথা বলতে পারতাম না। একটু খানি নিরব থেকে আবার মেয়েটির দিকে তাকালাম। সেই আগের মতেই ঘটনা, মেয়েটি তার চোখ ফিরিয়ে নিল। আমি আরো কৌতুহলী হয়ে পড়লাম। পাশে ভাইয়া, সামনে দু’জন ভদ্রলোক, আবার মেয়েটির পাশে তার মা, বাবা ও এক জন, সম্ভবত বড় ভাই। তাই ইচ্ছে করলেও মেয়েটির দিকে বার বার তাকাতে পারছিলাম না। কথায় আছে First sight is first Love আর্থাৎ প্রথম দেখা প্রথম প্রেম। আমার জীবনে হয়তো তাই হতে যাচ্ছিলো। বার বার ইচ্ছে হচ্ছিল মেয়েটির দিকে তাকাতে কিন্তু লজ্জা শরমে পাড়ছিলাম না। এক সময় লজ্জা সরমের বাঁধ ভেঁঙ্গে গেল। মেয়েটির দিকে তাকাতে লাগলাম। মেয়েটি তার উত্তর আমার চেয়েও অনেক বেশী দিচ্ছিল। আমার এমনও মনে হয়ে ছিল যে মেয়েটি বোধয় আমাকে চিনে, না হয় এতো বেশী করতো না! এভাবে তিন ঘন্টা চলে গেল। আমি বার বার হাত ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিলাম। এক পর্যায়ে ভাইয়াকে বললাম, ভাইয়া আমরা কখন পৌঁছব? ভাইয়া বললো, রাত ৯টা ১০ টা বাঁচবে। ভাবলাম, এখন ৬টা আরো সময় আছে। এমনও ভাবনা হয়েছিল যেন, ট্রেনটি নষ্ট হয়ে কোথাও আটকা পড়ে।

 

এভাবে তাকাতে তাকাতে আর পারিছিলাম না। তাছাড়া মেয়েটির বড় ভাই বোধয় আমাকে ফলো করছিল। কিন্তু কোন কিছুই মনে করছিল না। আমি মাঝে মাঝে ভাবতাম কখন মেয়েটির বাবা বা ভাইয়া উঠে এসে আমাকে লজ্জা দিবে এই বলে যে, এভাবে তাকিয়ে থাকো কেন। কিন্তু না তার কিছুই হলো না। তারা যে, অনেক সম্ভ্রান্ত ফ্যামিলির তা বুঝতে বাকি রহিল না। ট্রেনতো চলছেই চলছে, কিন্তু কোন ভাবেই মেয়েটির সাথে কথা বলার সুযোগ বা সাহস কোনটিই হলো না। কিন্তু আকার ইঙ্গিতে আমাদের কথা হচ্ছিল। মনে হলো মেয়েটি আমার কোন কালে কেউ ছিল, না হয় এমন লাগছে কেন! আপন হয়ে যাচ্ছে কেন! এক পর্যায়ে আমি অনিচ্ছা সত্ত্বেয় উঠে ওয়াশ রুমের দিকে গেলাম, আর তথায় অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে থাকলাম। ভাবলাম, মেয়েটি হয়তো উঠে আসবে আমাকে কিছু বলতে। কিন্তু না কিছুই ঘটলো না। উর্ধ্বনিশ্বাসে ফিরে এসে নিজের সিটে আসন গ্রহণ করলাম। মেয়েটি অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো, মনে হলো সে যেতে চেয়ে ছিল কিন্তু কোন অজানা কারনে যেতে পারেনি। এদিকে সময়ও ফুরিয়ে আসতে লাগলো, হয়তো ১/২ ঘন্টার মধ্যেই ট্রেন সিলেট স্টেশনে পৌঁছে যাবে, কিন্তু কিছুই করতে পারছিলাম না, নিজেকে মূর্খ ভাবতে লাগলাম। মেয়েটির নামটি পর্যন্ত জানতে পারছিলাম না, ভাবলাম সবাই কি আমার মতোই অকর্মণ্য, নাকি শুধু আমিই ! যদি জানতাম, ওর সাথে কোন দিনও আর আমার দেখা হবে না তবে, লোক লজ্জার ভয় ভাঙ্গিয়ে হলেও ওর সাথে কথা বলতাম এবং অন্ততঃ ঠিকানাটা নিতাম, পরে না হয় যা হবার হতো! এরই মাঝে নাস্তা দিয়ে গেল, ভাইয়া নাস্তা খেতে বললো, কিন্তু ভালো লাগছিল না, তারপরও খেতে শুরু করি। এক পর্যায়ে ইশারায় ওকে সাধলাম, ও মুচকি হেসে নিজেই নিজের হাতব্যাগ খুলে তা থেকে কেক বের করে খেতে শুরু করলো, খাওয়া শেষে আবার চিন্তার পালা। আবার ভাবলাম ও মেয়ে মানুষ ওতো একবার হলেও ওয়াশরুমে যাবে, তখন এগিয়ে গিয়ে একটা কিছু করবো, কিন্তু আশ্চর্য্য ব্যাপার ৭/৮ ঘন্টার ভ্রমণে সে একবারও ওয়াশরুমে গেল না! সময় ঘনিয়ে আসতে লাগলো, আর আমারও ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে পড়তে লাগলো। একপর্যায়ে আমি ওকে দেখিয়ে, কাগজ কলম বের করলাম এবং তাতে আমার ঠিকানা লিখলাম। তখনতো আর মোবাইল ছিল না, ও সবই বুঝল, তখন আমি ওকে ওয়াশরুমের ইঙ্গিত করে চিঠিটা ওয়াশরুমে রাখবো বুঝিয়ে ওয়াশরুমে গেলাম এবং ওয়াশরুমের ভিতরে ও যেন এসে পায় এমন ভাবে চিঠিটা রাখলাম এবং পুনরায় এসে সিটে বসলাম। ততোক্ষনে ট্রেন প্রায় সিলেট জংশনের নিকট চেলে এসেছে। কিন্তু মেয়েটি শুধু ওয়াশরুমের দিকেই কয়েকবার তাকালো কিন্তু ওয়াশরুমে গেল না। ততোক্ষনে ট্রেন স্টশনে চলে এসেছে। সবাই নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে কিন্তু আমি বসেই রইলাম, মনটা খারাপ হতে লাগলো। ভাবলাম ওকে বুঝি চির দিনের জন্য হারিয়ে ফেললাম।

 

যাত্রীরা সবাই নামতে শুরু করেছে আমি বসেই রহিলাম। হঠাৎ মেয়েটি আমাকে ইশারা করে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে কিছু চাইল, আমিও ইশারায় ওকে বললাম ওয়াশরুমে রেখে এসেছি। এমন সময় ভাইয়া আমার হাত ধরে টানতে লাগলো, বললো এসে পড়েছিতো চল। আমি ভাইয়ার সাথে চলতে লাগলাম, মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমর ধারনা ছিল, অন্ততঃ সে ওয়াশরুমে গিয়ে আমার চিরকুটটা নিবে।

 

ট্রেন থেকে নীচে নেমে হাঁটতে হাঁটতে রাস্তায় আসলাম। আর বার বার পিছনে তাকাতে লাগলাম মেয়েটি আসে কিনা, দেরি হচ্ছে ভেবে ভাবলাম হয়তো ওয়াশরুমে গিয়েছে! তাই অজুহাতে বাদাম কিনার ছলে ভাইয়াকে অপেক্ষা করাতে লাগলাম। কিছুক্ষন পর মেয়েটি ওর বাবা মার সাথে রাস্তায় আসলো এবং আমাকে দেখলো, কিন্তু কথা বলার সুযোগ ছিলনা। ওদের জন্য গাড়ি অপেক্ষা করছিল। মেয়েটি আমাকে কিছু বলার সুযোগ পেল না, কি একটা আমার দিকে ছুড়ে মারলো, অনেক মানুষের মাঝে কি ছুড়ে মারলো বুঝতে পারলাম না। তার মাঝেও অনেক খোঁজেছি, কোন কাগজ পেলেই দেখেছি, কিন্তু ভাগ্য বলে কথা, জান প্রান দিয়ে খোঁজেও কিছুই পেলাম না। আমার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের মানুষটা একটি প্রাইভেট জীপে চড়ে অজানার পথে পাড়ি জমালো কিন্তু আমার কিছুই করার ছিল না, আমিও ভাইয়ার সাথে বাসায় চলে এলাম। সারা রাত ঘুমাইনি মেয়েটির কথা ভেবে। মেয়েটি চিঠিটা নিল কিনা বা নিতে পেরেছিল কিনা তাই ভাবতে ভাবতে রাত পার হয়ে গেল, একটুও ঘুম আসে নি। ভাইয়ার বাসা ছিল আম্বর খানার পাশে। স্টেশন হয়তো ৬/৭ কিঃমিঃ দূরে হবে। তাই, ভোরে ‍উঠে আবার স্টেশনে গেলাম মেয়েটি চিঠিটা নিয়েছে কিনা কানফার্ম হওয়ার জন্য। গেইটে তালামারা ছিল তাই, ভাইয়া ভাবীকে জাগাতে হলো। ওনারাতো আবাক, এতো সকালে আমি কোথায় যাচ্ছি! বললাম ভাল লাগছেনা, একটু ঘুরে আসি। ভাইয়া তখন টাকা দিল, আবার আমার কাছেও টাকা ছিল, তারপরও নিলাম।

আমরা ট্রেনের যে কম্পার্টমেন্টে ছিলাম সেটা সম্ভবত খ বা ঙ ছিল। এখন মনে নেই, ঠিক ভোর ছয় টার দিকে স্টেশনে পৌঁছে জয়ন্তিকা একপ্রেস ট্রেন খোঁজতে লাগলাম। কিন্তু খোঁজে পাচ্ছিলাম না, তাই একজন গার্ডকে জিজ্ঞেস করলাম, ভাই গত রাতে যে জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ট্রেনটি এসেছিল সেটি কেথায়? ওনি বললো ঐ ট্রেনের বগিগুলি ঐ দিকে পড়ে আছে, পরিস্কার করা হবে আর ইঞ্জিন অন্যত্র আছে। তাই কিছুটা আসার আলো দেখলাম। আর প্রার্থনা করতে লাগলাম গিয়ে যেন দেখি আমার চিঠিটি নেই। খোঁজতে খোঁজতে সেই কম্পার্টমেন্টের মধ্যে পৌঁছলাম এবং ঠিক মতোই ঐ ওয়াশরুম খুজে পেলাম। চিন্তাগ্রস্ত ভাবে ওয়াশরুমে ঢুকে দেখি আমার চিরকুটটি, আমি যে ভাবে রেখে গিয়ে ছিলাম ঠিক সেই ভাবেই পড়ে আছে। চিরকুটটি হাতে নিয়ে ভাল ভাবে দেখতে লাগলাম, তখন আমার চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো, বিশ্বাস করুন পাঠক আমি একটুও বানিয়ে বলছি না। ভালবাসা যে, এতো কঠিন ও বেদনাদায়ক হতে পারে, তাও আবার ৭/৮ ঘন্টার মধ্যে, এটা সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর কেউ বলতে পারবে না!!বুঝার আর বাকী রহিল না যে, মেয়েটি আমার চিঠিটি যে কোন কারনেই হউক নিতে পারেনি এবং আরও বুঝলাম আমার স্মৃতি বিজরিত ভালবাসা হয়তো চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেললাম। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি, হাল ছাড়ার পাত্র আমি নই। গেলাম ভাবীর বাচ্চা হবে বেল, কিন্তু কোন সাহায্যই আমি ভাই ভাবীকে করতে পারিনি। প্রতিদিন সকালে বাসা থেকে বের হতাম এবং রাত ৯/১০ টায় বাসায় ফিরতাম। আমার এই লিখা অনেকের কাছে পাগলের প্রলাপ মনে হলেও কিন্তু সত্যি। হয়তো হতে পারে এটা একধরনের ইমোশন। কিন্তু এই ইমোশনটা কি শুধু আমার মধ্যেই ছিল না কি আরো অনেকের মধ্যেই আছে আমি জানি না। যদি কেউ আমার মতো এরকম প্রথম দেখায় কাউকে ভালবেসে থাকেন তারা হয়তো আমার এই লিখাটাকে বিশ্বাস করবেন।

 

প্রথমে ভেবে ছিলাম ও কলেজে পরে, তাই মহিলা কলেজগুলো খুজে বের করে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে কলেজ ছুটি না হওয়া পর্যন্ত কলেজের সামনে অপেক্ষা করতাম ওকে যদি পাওয়া যায় এই ভেবে, পরবর্তীতে মেয়েদের স্কুল! সিলেটের এমন কোন স্কুল কলেজ ছিলনা যেখানে আমি ঘন্টার পর ঘন্টা দাড়িয়ে বসে, থেকে ওকে খোঁজিনি। মাঝে মধ্যে বিপদে পড়ে যেতাম, যখন দেখতাম অনেক মেয়ে হিজাব পড়ে আছে। তখন বুদ্ধি খাঁটিয়ে ওদের সামনে যেতাম যেন ও থাকলে আমাকে চিনতে পারে। কিন্তু নির্মম পরিহাস, ওকে খুজে পেলামই না। গিয়ে ছিলাম ৬/৭ দিনের জন্য অথচ ১ মাস হয়ে গেল। সিলেটের সপিং মল, স্কুল/কলেজ, নিউ টাউন হতে শুরু করে পাড়া মহল্লা এমন কোন জায়গা আমি বাদ রাখিনি, সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত ওকে খুজতে! কি আশ্চর্য্য ব্যাপার, সিলেটের মতো একটি শহরে ১ মাস রাত দিন খোঁজেও ওকে আর পাওয়া গেল না।

 

জীবনে আমি সিলেট দুই বার গিয়েছি, প্রথম বারেই এই ঘটনা। অজানা শহরে যে আমি কি পরিশ্রম করেছি তা আল্লাহ ছাড়া আর কেহ জানে না । এদিকে বিশ্ব বিদ্যালয়ের পড়াশুনা, ভাবীর ছেলে হলো সব মিলিয়ে অর্থাৎ পাগল অবস্থায় ঢাকায় ফিরে এলাম। আমরা মানুষ কতো অবুঝ। যে ঠিকানাটা আমি দিয়ে দিলাম, ঐ ঠিকানায় গিয়ে ও খোঁজ নিয়েছি, ওর কোন চিঠি আসছে কিনা। মনে কতো ভাবনা ছিল, মনে এও ভেবেছিলাম হয়তো চিঠিটা থেকে ঠিকানাটা নিয়ে ও আবার চিঠিটা রেখে এসেছে, ওর আব্বা আম্মুর ভয়ে। কিন্তু না আর কোন দিনও কোন চিঠি আসেনি এবং তাকে আমি আর খোঁজে পাইনি।

 

ছাত্র মানুষ ছিলাম, পর্যাপ্ত টাকাও ছিল না। তার পরও তিন মাস পর আবার সিলেট যাই এবং আগের মতোই তাকে পাড়া, মহল্লা, দোকানপাট, ষ্টেশন সব জায়গায় খোঁজেছি কিন্তু তাঁকে আর পাওয়া যায়নি। অবশেষে, ধরেই নিয়েছি তাকে আমি চিরদিনের মতো হারিয়ে ফেলেছি। ওকে পাওয়া গেলে কি হতো সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হচ্ছে ওর নামটাও জানা হলো না। আজ প্রায় ৩০ বৎসর পাড় হতে চলেছে, এখনো কোন ট্রেন দেখলে আমার ওর কথা মনে পড়ে, আমি ওকে কখনোই ভুলতে পারিনি। মনে হয় একবার যদি ওকে দেখতে পেতাম, তাহলে জিজ্ঞেস করতাম,”আমার চিঠিটি ওয়াশরুম থেকে নাওনি কেন, কি-ই বা এমন ঘটনা ঘটেছিল”!!

তাই পরিশেষে বলতে চাই, ভালবাসা বড়ই অভুত জিনিষ। এটাযে কখন কার মনে কোথা থেকে আসবে তা কেউই বলতে পারবে না। ৩০ বছর প্রেম করেও অনেকের ভালবাসা জন্মায় না, আবার ৭/৮ ঘন্টার ভাললাগা ৩০ বছরেও ভুলা যায় না। আমার এখনো বিশ্বাস, আমার এই লেখাটি যদি কোন দিন কোন ভাবে ওর হাতে পড়ে তবে সে আমাকে চিনতে পারবে এবং আমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে।

লেখক-  ওসি (তদন্ত)

পরশুরাম, মডেল থানা,    ফেনী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*