,

“স্বার্থহীন, অদেখা ভালবাসা ও কিছু কথা”

“স্বার্থহীন, অদেখা ভালবাসা ও কিছু কথা”

আদিল মাহমুদ

মানুষ মরনশীল নিয়ত সত্য, সবাই এটা অবগত। তার অর্থ এই নয় যে, মানুষের অবহেলা, ছলনা, ব্যক্তিত্বহীনতা, হীনমন্যতা, দাম্ভিকতা, অন্যায় আচরণ, স্বার্থপরতা, বেঈমানী প্রভৃতির কারনে কোন কোন মানুষকে দুঃখে দুঃখে মৃত্যুর দিকে টেনে নিয়ে যাবে। মানুষের কাজ মানুষকে বিপদে সাহায্য করা, বাচাঁনোর চেষ্টা করা। কিন্তু আমরা কতিপয় ভদ্রবেশী শয়তান নিজেদের স্বার্থ, ধনসম্পদ ও ঐতিহ্য রক্ষার্থে জেনে শুনে মানুষকে মেরে ফেলছি যা কোন সভ্য সমাজের বিবেকবান মানুষ মেনে নেবে না কিংবা মেনে নেয়ায় কোন সচেতনতা আসবে না। এমনি একটি ঘটনা আমার কোমল হৃদয়কে স্পর্শ করেছে, যার যতটুকু আমি জানি হুবহু তুলে ধরছি।

মানিকগঞ্জের সিংগাইর থানাধীন জয়মন্টপে কবিতা নামে একটি মেয়ের বাড়ি, বাবা মা অসহায় গরিব, বড় ভাই বাবার অমতে অন্যের স্ত্রীকে বিয়ে করায় বাবা/মা অসহায়ত্বের মধ্যেও ছেলের সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ছেলে ও ছেলের বউ হয়তো এতে খুশই হয়েছে। বউ একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে এবং ছেলে রাজু ডুবাই চলে যায়। ভালোই আছে ওরা কিন্তু কোন দিনও বাবা/মা ও একমাত্র বোন কবিতাসহ ছোট ভাই রায়হান এর খবর নেওয়ার ক্ষীণ চেষ্টাও করেনি। এরি মাঝে কষ্ট-যন্ত্রণায় এই অসহায় সংসারে প্রায় দশটি বছর পার হয়ে গেছে!

 

জনৈক কামাল তখন সিংগাইর উপজেলায় কর্মরত একজন চাকুরিজীবী। একটি সাধারণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঐ পরিবারের সাথে কামাল সাহেবের পরিচয়। কবিতা ও রায়হান দুইজনই খুব ব্রেইনী, পড়াশুনার ইচ্ছাও তাদের প্রখড়। কিন্তু অর্থের অভাবে পড়াশুনা বন্ধের উপক্রম হয়ে ছিল। বাবা সামান্য কিছু কাজ করতেন, তাতে সংসার চালিয়ে ছেলে মেয়ের পড়াশুনা করানো দূরুহ ব্যাপার ছিল। আর তখন তাদের সহায়তায় কামাল সাহেব এগিয়ে আসেন, যদিও কামাল সাহেবের অর্থনৈতিক অবস্থাও ভাল ছিল না। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে ওদের পড়াশুনার জন্য যতটুকু সাধ্য তিনি করে যাবেন। কামালের কথায় বিশ্বাসী হয়ে ওরা দুই ভাই বোন ঢাকায় ভর্তি হয় পড়া শুনার জন্য।ওরা সম্ভবত ঢাকার মিরপুরে একটি বাড়ির ভাড়া বাসায় সাবলেট হিসাবে একটি রুম নেয়। বাসার মালিক ছিল ঢাকার শ্যামলীতে অবস্হিত একটি বেসরকারী এনজিও আশা তে চাকুরীরত, নাম রূপা। অনেক সুন্দরী ও অমায়িক, স্বামী ছিল বেকার। তারা স্বামী স্ত্রী দুজনেই অনার্সসহ মাষ্টার্স পাশ করা।

 

বাসার মালিক রূপা ঢাকা ইডেন কলেজ থেকে ও স্বামী রফিকুল ইসলাম(রনি) ঢাকা কলেজ থেকে পাশ করে। একটি কোচিং সেন্টারে তাদের পরিচয়, তারপর পরিচয় থেকে প্রেম এবং শেষে বাবা-মার অমতে বিয়ে। কবিতা ও রায়হানের রুম ভাড়া ছিল ৩৫০০/- টাকা। এই টাকাটা প্রতিমাসে কামাল দিতেন, আর বাকী খরচ বাবা কষ্ট করে দিতেন, কোন মাসে ভাড়া দিতে দেরী হলে বাড়ীওয়ালী রূপা কমালকে ফোন দিত। রূপা কামালকে বলতো,”এখনো এমন মানুষ আছে নাকি যে নি:স্বার্থ ভাবে মাসে মাসে বাসা ভাড়া দিবে আর ওরা পড়াশুনা করবে, আমার বিশ্বাসই হয় না”। তখন কবিতা ও রায়হান ওনাকে বুঝিয়ে বলে এবং ওনি কামালের সাথে কথা বলে বুঝতে পারে হয়তো সে ভাল। রূপা অনেক সময় কামালকে বলতো, আপনার শুশুর বাড়ি ঢাকা, ঢাকায় আসেন অথচ কোন দিনও আমাদের বাসায় আসলেন না। কামাল বলে, “সময় পেলে একদিন আসব”। কিন্তু এতো বছরেও কোনদিন যাওয়া হয়নি। কবিতা ঢাকা সিটি কলেজে মার্কেটিং এ পড়তো, আর ছোট ভাই স্কুলে। বর্তমানে কবিতা সিটিকলেজ থেকে মার্কেটিং এ অর্নাস/মাষ্টার্সে সারা বাংলাদেশে প্রথম হয় এবং রায়হান সাভার মেডিকেল কলেজে এম,বি,বি,এস এ অধ্যায়নরত, বাবা/মা দুই জনই পঙ্গু, ভাই নিরুদ্দেশ।

 

একদিন কবিতা জানায়,বাড়িওয়ালি রূপার স্বামী রনি চাকুরি করার জন্য কুয়েত চলে গেছে। রূপা তার ব্যাংকের সমস্ত টাকা ও কিছু গহনা বিক্রি করে স্বামীকে বিদেশ পাঠায়। রূপা ছিল মা/বাবার পালিকা সন্তান, স্বামী/স্ত্রী দুজনে ৫ বৎসর প্রেম করে বিয়ে করে। বিদেশ যাওয়ার পর স্বামী রনি ছয় মাস রূপার সাথে যোগাযোগ রাখে। পরে আর যোগাযোগ না করায় রূপা তার স্বামী যেখানে থাকে তথায় স্বামীর বন্ধুদের সাথেও যোগাযোগ করে। তারা জানায় রূপার স্বামী তাদের ওখানে থাকে না এবং সে এখন আর ফোনও চালায় না। বছরের পর বছর রূপা তার প্রিয় স্বামীকে পাগলের মতো খুজতে থাকে। এই দিকে রূপাও অসহায় হয়ে পড়ে। তাদের বাসা ভাড়া ছিল মোট ৯০০০/- টাকা। আবার কথায় আছে বিপদ যখন আসে সব দিক থেকেই আসে। যে এনজিওতে রূপা চাকুরী করত: সেই এনজিও এর বসও, স্বামী বিদেশ চলে যাওয়ায় রূপাকে কু-দৃষ্টিতে দেখত। রূপা অনেক সময় বসের অশালীন আচরনে বাধ্য হয়ে প্রতিবাদ করতো। এমনিতেই স্বামী হারা, তার উপর অসভ্য আচরন সব মিলিয়ে বসের সাথে গন্ডোগোল তীব্র আকার ধারন করে। এক পর্যায়ে বস ক্ষিপ্ত হয়ে রূপার বিরুদ্ধে কাজে অবহেলার অজুহাত এনে তাকে চাকুরী থেকে বরখাস্ত করে। এতেকরে রূপা আরো অসহায়, অস্বচ্ছল ও নিরুপায় হয়ে পড়ে।

যে মানুষটা কামালকে ফোন করে বলতো,”ওদের ভাড়া আরো ৫০০/- টাকা বাড়ানো উচিত, কারন আসল বাড়িওয়ালা ভাড়া ১০,০০০/ টাকা করেছে। শুধু আপনার দিকে তাকিয়ে বাড়াচ্ছি না। কারন আপনি যদি নিঃস্বার্থ ভাবে এতো কিছু করতে পারেন আমি কেন পারবোনা”! কিন্তু কামালের কষ্ট হয় এই ভেবে যে এই ভালো মানুষটাকে সাত বছরের পরিচয়ে কোন দিনও কামাল দেখে নাই। দুই দিন জোর করে কবিতা ভিডিও কলে দেখিয়েছে। পরহেজগার ছিল, মুখের কিয়দাংশ ছাড়া কিছুই দেখা যায় নি। এদিকে অবস্থা আরো বেগতিক হয়ে পড়ে, যে মানুষটা কামালের কাছে কবিতা ও রায়হানের ভাড়া চাইতো, সে মানুষটা এখন আর ভাড়া চায়না। জানতে চাইলে, কবিতা জানায় রূপা আপা নিজের ল্যাপটপ বিক্রি করে এই মাসের ভাড়া দিয়েছে। এদিকে রূপা একটি কিন্ডার গার্টেনে ৩০০০/- টাকা বেতনে কাজ শুরু করে। ৩০০০/- আর ৩৫০০/- এতো বাড়ি ভাড়াই হয় না খাবে কি? রূপা খুব লাজুক স্বভাবের ছিল।

 

সৃষ্টিকর্তা কখন কাকে কি করে তা এই জগতে কেউ বলে দিতে পারে না, উদাহরণ শুধু রূপা। রূপার বাসা ছাড়া, খুবই জরুরী হয়ে পড়ে কিন্তু যাবে কোথায়? পালক বাবা/মাও তাকে সহ্য করতে পারে না! পালিয়ে এবং তাদের মতের বিরুদ্ধে বিয়ে করায় বাবা-বোনরা রূপার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলে। ভাগ্য বলে কথা, বাড়িওয়ালি থেকে রূপা কাজের মেয়ে হয়ে যায়। আগে কবিতা কাজ করতো এখন রূপা কাজ করে। কবিতার মুখে এইসব শুনতে শুনতে কামালের মনে কষ্ট জাগে, কামাল সাহস যোগাতে থাকে। রূপার মানসিক অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে পড়ে। ফলে স্কুলেও ঠিকমত ক্লাস করাতে পারতো না। অতএব ঐ ৩০০০/- টাকার চাকুরীটাও চলে যায়। খাওয়ার কিছু থাকে না, গায়ের কাপড় ছিড়ে যায়, সবই কামাল শুনতে পায়, কবিতার কাছ থেকে।

 

একদিন কামাল নিজ থেকে ফোন দিয়ে ওনাকে সাহস যোগায়। ওনি কামালকে বলেছিল, আপনিযে ফেরেস্তার মতো মানুষ তা কবিতার মুখে শুনতাম কিন্তু পুরোপুরি বিশ্বাস করিনি, আজ বিশ্বাস করতে বাধ্য হচ্ছি। কামালের মনে পড়ে, অনেক দিন ফোনে যোগাযোগ করে বলেছিল, “অন্তত একবার আমাদেরকে দেখে যান, আপনাকেও এক নজর দেখি”। কিন্তু বিধি বাম, এক দিকে চাকুরি অন্য দিকে বউ-বাচ্চা, সময় হয়ে উঠেনি। কামালের নিজের অবস্থাও তেমন ভালো ছিল না। কিন্ত কামালের শক্তি ছিল, বউ, ভাই, বোন। কামালের ভাই ,বোন,শ্যালক, শ্যালিকা সহ কয়েক জনই আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস ও নিউজিল্যান্ডে বসবাস করতো। শুশুরের অবস্থাও ভাল ছিল, অন্য ভাই ব্যবসায়ী। তাই কামাল তাদের শরনাপন্ন হয়, কামাল যে টাকা পায় তা দিয়ে নিজের সংসার চালানোই দুষ্কর হয়ে পড়ে। তার উপর ১০,০০০/ টাকা ভাড়ার দায়িত্ব ও অন্যান্য খরচতো আছেই! আবার মাঝে মধ্যে ডাক্তারের কাছেও পাঠাতে হয়! যতক্ষন না স্বামী ও বাবা মার কাছে রূপাকে পৌছাতে না পারে ততোদিন কামালের শান্তি আসবে না । তাই একদিন কামাল কবিতার কাছে ৩০০০/- টাকা পাঠায়, রূপাকে খুলনা খান জাহান আলী রোডে, সরকারি কলেজের পাশে তার বাবার বাড়িতে পৌছে দিতে।

 

কবিতা প্রথমে এতো দূরে ভেবে ভয় পাচ্ছিল। কিন্তু কামালের কথায় রাজি হয়ে যায় এবং রূপাকে নিয়ে বাবার বাড়ি খুলনা যায়। রূপার স্বামীর বাড়িও খুলনা ছিল, কিন্তু রূপা স্বামীর বাড়ি চিন্ত না। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, গিয়ে দেখে বাবা মরা গেছেন। ফলে, রূপাকে দেখে, মা ও বোনরা আরো ক্ষিপ্ত হয়ে যায়, তার উপর আবার পালক ছিল। বাবার কবরও জিয়ারত করতে দেয় নি, ওরা বাড়ির বাহিরে অপেক্ষায় থেকে নিরুপায় হয়ে পুনরায় ঢাকা চলে আসে। অবস্থা আরো বেগতিক দেখে কামাল রূপার জন্য কাপড় কেনা ও স্বামীর খোজ করার জন্য কিছু টাকা পাঠায়, যদি মানুষটা বাঁচে এই আশায়। রূপা টাকা পেয়ে নিজের জন্য কমদামি কিছু কাপড় কিনে এবং কবিতা ও রায়হানকেও কিনে দেয়। কারণ, সবাই অসহায়, আর বাকী টাকা দিয়ে স্বামীর খোঁজে কুয়েত এম্বেসিতে দিনের পর দিন ধর্না দিতে থাকে। কিন্তু কুয়েত দূতাবাস তার স্বামীর কোন খবর দিতে পারে নাই।

 

কিন্তু কেন, কেন তার স্বামী এই ভাবে তাকে ভুলে যাবে! এতদিনের ভালবাসা কি মিথ্যে, নাকি স্বামীর কোন বিপদ হয়েছে! কিন্তু না রূপা একদিন জানায় তার স্বামী ঐ দেশে ভাল আছে, আবার বিয়ে করেছে, কারমাধ্যমে জেনেছে তা জানায়নি। রূপার মানসিক অবস্থা আরো খারাপ হয়ে যায় বাঁচে কিনা সন্দেহ, কামাল তার সাধ্যমত সাহায্য করতে থাকে। এক পর্যায়ে কামাল নিজে বাঁচতে ছোটকালের বন্ধু শিল্পপতি আকরাম ও তার ছোট ভাইয়ের সাহায্য চায়। ভাই আবার আকরামের ফার্মেই ম্যানেজার হিসেবে চাকুরি করতো এবং নিজেও টুক টাক ব্যাবসা করতো। আকরাম এক কথায় দুজনের জন্যই চাকুরি ঠিক করে ফেলে এবং বলে কালই অফিস করতে।

 

কিন্তু, বিপদ এখানেও পিছু ছাড়ছিলনা। কবিতা কোন ভাবেই রূপাকে চাকুরি করতে রাজি করাতে পারল না। কারণ, পুরুষ মানুষের উপর ছিল তার বেদনা দায়ক অবিশ্বাস। স্বামী ও অফিসের বস এই দু’ জনেই তাকে পাগল বানিয়েছি। রূপা নিজের রুম বন্ধ করে না খেয়ে ঘুমিয়ে থাকত, জোর করেও খাওয়ানো যেত না। অবশেষে, কবিতা একাই চাকুরিতে যোগদান করলো, প্রথম ছয় মাস শিক্ষানবিশ, বেতন ৫০০০/টাকা। কবিতার অনুপস্থিতিতে রুপা আরো অসুস্থ হয়ে পড়লো, তাছাড়া, অফিসে আসা যাওয়াতেই কবিতার ৩০০০/টাকা খরচ হয়ে যেত, ফলে, কবিতাকে চাকুরি ছেড়ে রূপার কাছেই থাকতে বলা হলো কবিতা তা-ই করে।এই অবস্হায় কবিতা বি, সি, এস পরীক্ষা দেয়া শুরু করেছে এবং রায়হান এইচ. এস. সি পরীক্ষাতে গোল্ডেন+ পেয়েছে।

এক পর্যায়ে, কামাল টাকা দিতে অপারগ হয়ে পড়ে, লোন করে আর কতো টাকা আনা যায়! তাই, কবিতাকে বি সি এস বন্ধ করে রূপাকে নিয়ে কবিতার বাড়ি চলে যেতে বলে। মনের বিরুদ্ধে হলেও রূপা, কবিতা, রায়হান, ফ্রীজ, টিভি ও অন্যান্য জিনিসপত্র বিক্রি করে ৩ মাসের বকেয়া ভাড়া পরিশোধ করে রূপাকে নিয়ে দেশের বাড়ি চলে যায়, কামালও কিছু টাকা দেয়। রূপার সাথে যোগাযোগ প্রায় বন্ধ ছিল কারন, ওর ফোন নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কবিতার বি, সি,এসও শেষ, রূপার জীবনও শেষ। স্বামীকে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও আর পাওয়া যায়নি। বেঈমান, প্রতারক, ভন্ড, লোভী স্বামী কোনদিনও আর রূপার খোঁজ নেয়নি। কামালেরও দিনে দিনে সাধ্য সীমিত হয়ে আসছিল। তাই, রূপার খাওয়া বাবদ মাসে ২০০০/- টাকা দেয়া ছাড়া আর পথ ছিল না। আর কবিতাকে বলতো, “আমি ভাল থাকলে তোমরাও ভাল থাকবে”, রূপাও এটা বিশ্বাস করতো। কামালকে বলতো ফেরেস্তা কখনো দেখিনি, “তবে মানুষ রুপি ফেরেস্তা দেখেছি, আর সে আপনি”!

কবিতা বলতো,”রূপা আপা সাড়া দিন বাড়ির কাজ করে। তার আচরন পাগলের মতো, আমার ভয় হয়”। কবিতার বাবা মা ও রূপাকে কাজ করতে নিষেধ করতো। তারপরও রূপা কাজ করতো, কারন তার ধারনা ছিল কাজ না করলে যদি তারা তাকে থাকতে না দেয়। এক পর্যায়ে রূপা কারো সাথে তেমন কথা বলতো না শুধু নামাজ, রোজা ও কোরআন শরীফ ছিল তার সঙ্গী। তখন কবিতর সাথে কামালের পরামর্শ হলো, ওকে বাচাঁতে হলে ওর একটা বিয়ে দেয়া দরকার। কামালের একটা প্রিয় বন্ধু ছিল নাম রঞ্জু কিন্তু বিবাহিত, ৮/১০ বৎসর সন্তান হয় না। ওর বাবা/মা ওকে প্রচন্ড চাপ দেয় আরেকটি বিয়ে করার জন্য। এক পর্যায়ে বাবার মৃত্যু না দেখার বিনিময়ে বিয়ে করতে রাজি হয়। তখন কামাল রঞ্জুকে, রূপাকে বিয়ে করার জন্য বলে। রঞ্জুও কখনো কামালের মতো রূপাকে দেখে নাই। তারপরেও সে রাজি হয়ে যায় এবং বলে আপনি যখন ঠিক করেছেন তখন এ মেয়ে খারাপ হতে পারে না। তাছাড়া আমারতো সন্তান দরকার সুন্দরী নয়। এই প্রস্তাব কবিতার মাধ্যমে রূপাকে দুই বছর আগে দিলে রূপা কান্নাকাটি শুরু করে বলে যে, “আমি যে বিয়ে করতে পারবনা”।

কামাল আবার রঞ্জুর সাথে রূপাকে ফোনে কথা বলিয়ে দেই। কামাল ভেবেছিল, হয়তো মনের দুঃখে রূপা রাজি হচ্ছে না। পরে চাপ দেওয়াতে এতো বৎসর পর বেড়িয়ে আসে আসল ঘটনা, “রূপা কোনদিনও মা হতে পারবে না”। জানা যায়, স্বামী থাকতে রূপা গর্ভবতী হয়, পরে ইনফেকশন, ডাক্তার রূপাকে বাচাঁতে তার দুটি বাচ্চার থলি ফেলে দেয়। তাই সে রঞ্জুর জীবন নষ্ট করতে পারবে না, কারন রঞ্জুতো বাচ্চার জন্যই বিয়ে করবে। এতে করে রূপার মানষিক অবস্থা আরো খারাপ হয়ে পড়ে। তখন আর তাকে বিয়ের জন্য চাপ দেয়া হয় নাই। এই কথাটা রূপা সবার কাছে লুকিয়েছিল, এমনকি কবিতাও জানত না।

অবশেষে, কামাল বুঝতে পারলো বেঈমান, প্রতারক স্বামী, যাকে রূপা তার সর্বস্ব দিয়ে বিদেশ পাঠিয়েছিল, তার প্রতারনা ও বেঈমানীর আসল কারন ছিল এটাই! কামালও এই সব করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। তাই অনেকদিন ফোন বন্ধ করে রেখেছিল। শান্তনা ছিল, কবিতারা খেলে রুপাও খাবে। কামালের অবস্থাও ভাল ছিল না, অসুস্হ ছিলো, ভাবলো ভালো হলে ফোন দিবে। তিন মাস পর একদিন কয়টা টাকা পাঠাবে বলে কবিতাকে ফোন দেয়, কবিতা ফোন ধরেই কান্নাকাটি শুরু করে দেয়, বললাম কি হয়েছে খুলে বলো। বললো, “রূপা আপা আর নেই, চিরদিনের জন্য চলে গেছে”। কিভাবে জানতে চাইলে বলে ও তার মাকে নিয়ে সাভার হাসপাতালে বাবাকে দেখতে গিয়েছিল, অসুস্থ্য রূপাকে বাসায় রেখে। এসে দেখে চৌকির পাশে নীচে পড়ে মরে আছে, কঠিন মানসিক নির্যাতনের শিকার স্রষ্টার সৃষ্টি সুন্দরী রূপা। তখন সবাই মিলে তার জানাজা শেষে তাকে কবরস্থ করা হয়, তারিখ- ইং ১১/ ৮/ ২০১৯ ।

এই সব বলার অর্থ হলো মানুষকে দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করা। যে মানুষটাকে কোন দিন দেখেনি, সে কোথায় থাকে তা দেখেনি অথচ কষ্ট করে, এই অসহায় মেয়েটাকে বাচাঁনোর জন্য কতই না কষ্ট করেছে কামাল! কারন, মানুষ যদি মানুষের বিপদে না-ই আসে তবে সে কিসের মানুষ! সাত বৎসর পরিচয়ে কোন দিন কামাল তাকে দেখতেও যায়নি, দূর থেকে কথা বলে ও অর্থ দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিল। কামাল তার পরিবারের কথা ভেবে, কাছে যাওয়ার চেষ্টা থেকে বিরত থেকেছে। কিন্তু যদি জানতো রূপা এই ভাবে সবাইকে ছেড়ে পৃথিবী থেকে চলে যাবে তবে অভাগিনীকে দেখতে একবার হলেও যেতো।

পরিশেষে, ধিক্কার জানাই সেই সকল পাপিষ্ট স্বামীদের যারা স্ত্রীর অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাদেরকে তিল তিল করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে ! মানুষের বিপদে যে, মানুষ এগিয়ে আসে এবং প্রতারণার যে একটা সীমা থাকা উচিত, এই গল্পই তার প্রমাণ। তাই, মেয়েদেরকে জোড়ালো ভাবে এগিয়ে এসে এসব নরপিশাচদের কবল থেকে কোমলমতি মা-বোনদেরকে উদ্ধার করতঃ সেই ভয়ংকর অপরাধীদেরকে আইনের কাঠ গড়ায় দাড় করিয়ে শয়তানদের প্রকৃত মুখোশ খুলে দিতে হবে। না হয়, আমাদের মা বোনদের নিরাপত্তা কোন দিনও সূর্যের আলো দেখবে না ?এখনো বিপদ কাটেনি, কারণ কবিতা ও রায়হান বর্তমানেও ঝুঁকির মাঝে, তাদের চলার পথও রুদ্ধ, তাদের দেখার কেউ নেই এই ধরা’য়!!

 

লেখক –  ওসি (তদন্ত) 

পরশুরাম মডেল থানা, ফেনী জেলা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*