,

মানবাধিকার: নিরপেক্ষতাই শান্তির বাহক

আদিল মাহমুদ: ild

মানবাধিকার মানুষের জন্মগত অধিকার। স্থানীয় ও আর্ন্তজাতিক আইনের দায়িত্বে এই অধিকারের স্বীকৃতি অনস্বীকার্য। সৃষ্টিকর্তা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তার ইচ্ছে মতো, সৃষ্টির ইচ্ছা মতো নয়। তাই সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিকরা কোন মানুষকে কোন ধরনের অন্যায়-অত্যচার,পক্ষপাতিত্ব, বর্ণবাদ ও ধর্মীয় উগ্রবাদের মধ্যে নিক্ষেপ করা যাবে না।

কারন, মানুষ সৃষ্টির সেরা, সব কিছুর উর্ধ্বে। হিংসা, বিদ্ধেষ, মারামারি, রাহাজানি, খুনাখুনি কোন কিছুকে সৃষ্টিকর্তা স্বীকৃতি দেন নাই!

তবে মানুষ কেন সৃষ্টিকর্তার আদেশ, নির্দেশ, উপদেশ স্বেচ্ছায় মানতে বিরক্ত হচ্ছেন! কিসে মানুসের এতো দম্ভ!হাজার বছর ধরে মানবজাতী, পক্ষপাতিত্বের সম্মুক্ষীন হয়ে আসছে। পক্ষপাত এই ধারা’য় স্পষ্ট একটি অভিশাপ যা তিল তিল করে মানুষকে অন্যায় অত্যাচারে লিপ্ত হতে বাধ্য করছে, যা কেউ জেনে করে কেউ বা না বুঝে করে।

তবে চির সত্য যে,নিরপেক্ষতা বলতে কিছুই নেই। যেমন ধরুন, বাবা-মা, সন্তানের পক্ষে কথা বলতে পছন্দ করে, ভাই, ভাইয়ের পক্ষে, বোন, বোনের পক্ষে ভাই, স্বামী, স্ত্রীর পক্ষে, স্ত্রী, স্বামীর পক্ষে। তবে এখানে একটা প্রথা বিদ্যমান সেটা হচ্ছে সর্ম্পকটা ভাল থাকলেই কেবল ঘটে নচেৎ নয়।

আবার ধরুন, প্রতিটি ধর্ম তার ধর্মের পক্ষেই কথা বলে যদিও এটা ভাল কাজ, কারন সব ধর্মেই ন্যায়ের স্বীকৃতি ও অন্যায়ের প্রতিবাদের কথা বলা আছে। কিন্তু ভেবে দেখুন মানুষ কি তা মেনে চলছে, নাকি মেনে চলার চেষ্টা করছে?

ধরুন যদি দুই ভাইয়ের মধ্যে দ্বন্ধ থাকে তবে,বাবা মা সেই দ্বন্ধ মিটানোর জন্য জান-প্রান দিয়ে চেষ্টা করে। আবার যদি এমন হয় যে, কোন মুসলমানের সাথে কোন হিন্দুর দ্বন্ধ থাকে তবে এই মূল্যবান মুহুর্তে দেখা যায় যে, মুসলমান মুসলমানের পক্ষে এবং হিন্দু হিন্দুর পক্ষে দাড়িয়ে যায় ধর্মীয় টানে।ন্যায় অন্যায় বিচার করার ক্ষমতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, এতে করে ধর্মীয় বিশ্বাস ও উগ্রতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। কিন্তু ধর্মীয় দৃষ্টি দিয়েই তাকিয়ে দেখুন ধর্ম কিন্তু তা বলেনি। ধর্ম স্পষ্ট ভাষায় ন্যায়, অন্যায়ের পার্থক্য নিরূপন করেছেন।

সবার আগে, আমরা সবাই মানুষ এবং হিন্দু, মুসলমান সবাই স্রষ্টার সৃষ্টি। ন্যায়, অন্যায় বিচার করা সবার আগে কর্তব্য। এখানে অন্য কিছুর স্থান অর্ধতব্য। ভেবে দেখুন, হিন্দু বা মুসলমানদের কেওই মঙ্গল গ্রহ কিংবা বৃহস্পতি গ্রহ থেকে আসে নাই। সবাইর জন্ম পৃথিবীতে এবং সবাই জন্মসূত্রে পুরো পৃথিবীর নাগরিক।

অথচ দেখুন আমরা কতই না হাজার ভাগে বিভক্ত!আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে একটি জিনিস লক্ষ্যণীয়, যেমন ধরুন আমার মা যদি কোন কারনে হিন্দু ধর্ম গ্রহন করে বা অন্য ধর্ম গ্রহন করে তবে কি আমি আমার মাকে ভুলে যাব, অত্যাচার করব! না এটা হতেই পারে না, ধর্ম যার যার সহজাত।

একটি উদাহরন দেয়া প্রয়োজন, আমাদের প্রিয মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ) বলেছেন, “তোমরা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করিওনা এবং জোর পূর্বক নিজের ধর্ম অন্যের উপর চাপিয়ে দিওনা”। এই শিক্ষা দ্বারা যে ওনি কি বুঝিয়েছেন, জ্ঞানীরা ও ধর্ম বিজ্ঞানীরা তা নিশ্চয়ই অনুধাবন করে থাকেন।মনে রাখতে হবে যে, আমরা সবাই মানুষ এবং আমাদের অতি পূর্ব পুরুষরা হয়তো আপন ভাই ই ছিলেন, আর বাবা-মার কথা নাই বললাম। মানুষ সৃষ্টির সেরা, বুদ্ধি ও বিদ্যায় তারা অতুলনীয়। সৃষ্টির আর কোন প্রানীর শক্তি নেই যে, মানুষকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখায়। অথচ আমরা কি করছি!মনুষত্য, জ্ঞান, বিদ্যা, বুদ্ধি, ন্যায় অন্যায়ের পার্থক্য আমরা দিনে দিনে ভুলে যাচ্ছি। মনে হয় কেবল এক অদৃশ্য শক্তি আমাদেরকে তাড়া করছে আর বলছে শান্তিতে থেকো না,শান্তি তোমাদের মঙ্গল বয়ে আনবে না। আর আমরা অতি বুদ্ধিমান প্রানী হয়ে অশুভ মোহকে স্বাগত জানাচ্ছি এই বলে যে, আর ভাল লাগেনা, নিরিবিলি, নিরবচ্ছিন, সুনিদ্রা আর সহ্য হচ্ছে না।আমরা একটি মনোরম শস্য-শ্যামলায় আবৃত পৃথিবীর জন্মসূত্রে অধিবাসী, কোন ভীনগ্রহ থেকে আসিনি। তাই আমরা সকলেই মানুষ এবং সবাই সমঅধিকারী, এখানে ধর্ম বর্ণ, গোত্র ইত্যাদি মানুষের উর্দ্ধে নয়। ধর্ম মানুষের মঙ্গলের জন্যই প্রেরিত হয়েছে,অমঙ্গলের জন্য নয়। অথচ আজ আমরা ন্যায় অন্যায়ের বিচার না করে, ধর্মের পক্ষ নিয়ে একে অপরের বিপক্ষে চলে যাচ্ছি। কিন্তু প্রথমে ভাবা দরকার কোনটা ন্যায় আর কোনটা অন্যায়, কোনটা সঠিক আর কোনটা বেসঠিক। সভ্য মানুষ হয়ে মানুষের পক্ষ নিয়ে অন্তত এই ভাবনাটা থাকা খুবই জরুরী।মানব জাতির জন্য যত অকল্যান শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বয়ে আসছে তার প্রধান কারনই হচ্ছে, অস্বচ্ছতা ও অনিরপেক্ষতা। পক্ষপাত হাজার হাজার মরন ব্যাধি ভাইরাসের চেয়েও ভয়ংকর। যে দিন পক্ষপাত বলে কথিত মারনাস্ত্রটি এই পৃথিবী থেকে চিরতরে বিলীন হয়ে যাবে শুধু সেই দিনইশান্তি নামক উজ্জ্বল আলো পৃথিবীতে ফিরে আসবে নচেৎ মৃত্যুর পরও নয়। তাই পিঞ্জর খুলে দিতে হবে এবং কবির ভাষায় বলতে হবে “পিঞ্জর খুলে দিয়েছি যা কিছু বলার ছিল বলে দিয়েছি, যারে যাবি যদি যা”। আমার দৃষ্টিতে পক্ষপাত ভয়ংকর ব্যাধি যা স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর কারো দ্বারা এইব্যাধি নিরাময় সম্ভব নয়। এই পক্ষপাতিত্বের কালো ছোবলে প্রতিটি জনপদে মানুষের জন্মগত অধিকার তথা মানবাধিকার লংঘিত হচ্ছে। আর এই বিষয়টি আমাদের এই পৃথিবীরই কিছু সুহৃদয় মানুষের দৃষ্টি আকর্ষন করায়, মানুষের কল্যানের ও মানুষের ন্যায্য পাওনা আদায়ের জন্য ১৯৭৮ সালেআর্ন্তজাতিক মানবাধিকার সংস্থা গঠিত হয়। বিশ্ব মানবেতর মানুষ দেখছে যে, মানুষের অধিকার সমূহ আঞ্চলিক যুদ্ধ, সংঘাত ও হানাহানির কারনে বার বার লংঘিত হচ্ছে। মানবাধিকার হচ্ছে, দৈনন্দিন জীবনে চলার জন্য মানুষের যে অধিকার, রাষ্ট্রের সংবিধান কর্তৃক স্বীকৃত তাই।মানবাধিকার রক্ষায় যারা এগিয়ে এসেছেন সংক্ষেপে বলা যায় ১। সাইরাস সিলিন্ডার(৫৩৯ বি সি) ২। মদিনা সনদ(৬২২ সি) ৩। ম্যাগনা কার্টা(১২১৫ সি)৪। পিটিশন অব রাইটস(১৬২৮ সি)৫। বিল অব রাইটস(১৬৮৯ সি) উল্লেখ যোগ্য। সার্বিক ভাবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ(১৯৭৮)গুরু দায়িত্ব পালনকরছেন। তবে একটি জিনিস স্পষ্ট যে, শক্তিশালী জাতিগুলো কর্তৃক দুর্বল জাতিগুলোর উপর অর্পিত আচরন আজকাল মানবাধিকার কে উপহাসের পাত্রে পরিনত করেছে। আমাদের প্রিয় মহানবী (সাঃ) ওনার বিশ্ববিখ্যাত বিদায় হজের ভাষনে মানবাধিকারের কথা স্পষ্ট করে বলে গেছেন।মানবাধিকার সংস্থায় নিয়মিত শ্রম দিচ্ছেন, ১। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, যার জন্ম আমেরিকায়। ১৯৭৮ সালে হিউম্যান রাইট ওয়াচ গঠিত হয়, নিউইয়র্কে প্রধান কার্যালয়। বলা বাহুল্য সৃষ্টিকর্তা সীমা লঙ্ঘন কারীকে পছন্দ করেন না। যেমনি আমাকেও না কারন আমিও সীমা লঙ্ঘন কারী।তাই আমার শিক্ষা আমি পেয়েছি এবং সর্তক হয়েছি। বাকী আপনি, তাই এখনি প্রস্তুত হউন, দেখুন সামনে আপনার জন্য কি অপেক্ষা করছে। ঘুরে ফিরে আমার একটি প্রার্থনা পক্ষপাতিত্ব ধ্বংস করো, “নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখো”। দেখবেন আপনি অনেক উর্ধ্বে চলে গেছেন যা সারা জীবনেও আপনার চেষ্টায় আপনাকে নিতে পারবে না।নিরপক্ষেতা ও সুবিচার মেনে চলা মানব জাতির হাতিয়ার। এই ভয়ংকর অস্ত্র মানুষ কর্তৃক সৃষ্টি কোন অস্ত্র থেকেই নিম্ন মানের নহে। আরেকটি উদাহরন না দিলেই নয়। একদিন এক ইয়াহুদি ও এক মুসলমান বিচার প্রার্থনায় আমাদের মহানবীরসম্মুখে উপস্থিত হলেন। দু’জনের কথোপকথন শুনে নবীজি ইয়াহুদির পক্ষে রায় দিলেন। মুসলমান অবাক হয়ে গেলেন, যার জন্য এতো কিছু করলাম সেই নবী আজ ইয়াহুদির কাছে তাকে ছোট করলেন! নিজের ধর্মের বিপক্ষে অবস্থান নিলেন! মনোক্ষুন্ন হয়ে উক্ত মুসলমান কাতর অবস্থায় তৎকালনিশাসক ওমর (রাঃ) আনহুর দরবারে গেলেন এবং পুনরায় বিচার প্রার্থনা করলেন। বললেন হুজুর আমি একজন খাঁটি মুসলমান আর সে একজন বিধর্মী ইয়াহুদি অথচ আমি সঠিক বিচার পাইনি বিধায় আপনার স্বরনাপন্ন হলাম। মুসলমান ভেবেছিল ওমর (রাঃ) খুশী হবেন। তিনি জানতে চাইলেন ইয়াহুদিরপক্ষে যে রায় দিয়েছেন তিনি কে? উত্তরে মুসলমান বললো তিনি হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)। পরক্ষনে ওমর(রাঃ) মুসলমানকে বললেন তুমি কি এই বিচারে সন্তুষ্ট নও ! মুসলমান বললো না।তখন ওমর (রাঃ) ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, “যে ব্যক্তি নবীজির বিচারে খুশী হতে পারে না তার বেচেঁ থাকার কোন মানেই হয় না”। এই বলে তিনি তার তলোয়ার বের করে এক কোপে ঐ মুসলমানের গর্দান বিচ্ছিন্ন করে ফেললেন।এবার ভাবুনতো নিরপেক্ষতা ও সুবিচার কাকে বলে!এখানে নবীজি কোন ধর্মকে টেনে আনেননি, এনেছেন সৃষ্টির সেরা মানুষকে,ন্যায় ও অন্যাকে এবং অবশেষে নিরপক্ষেতাকে। এতে আমরা এই শিক্ষাই পাই যে, ন্যায় অন্যায় ও নিরপক্ষতা বিচার করতে হবে সব ধর্মের উর্ধ্বে থেকে,এখানে পক্ষপাতিত্বের কোন স্থান নেই। হিন্দু ধর্মের দেব দেবী যেমন ১। স্বরস্বতী, ২। দেবী লক্ষ্মী, ৩। মা কালী ৪। মা দূর্গা, ৫। রাম, ৬। শ্রী কৃষ্ণ, ৭। গনেশ, ৮। ভ্রম্মাহ, ৯। বিষ্ণু, ১০। শিব, সকলেই নিপেক্ষতা, স্বচ্ছতা ও ন্যায় বিচারের পক্ষে জোরালো ভুমিকা রেখেছেন।কোন দেব দেবীই ন্যায়ের বিরুদ্ধে ও অন্যায়ের পক্ষে কথা বলেননি। তাই দেখা যায় যে, সকল ধর্মের প্রধানগনই ন্যায় সুবিচার ও নিরপেক্ষতার পক্ষ হয়ে ধর্ম প্রচার চালিয়ে গেছেন। তবে আজ কেন মানুষ এই সব নীতি বাক্য না মেনে নিজেদের ইচ্ছে মতো পক্ষ নিয়ে কাজের চর্চা করেন, যা কোন ভাবেই গ্রহন যোগ্য নহে।পৃথিবীর সমস্ত ধর্মই সম্মানের, সকলেই তার ধর্মকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরন করে থাকে। তবে তার অর্থ এই নয় যে, ধর্মের টানে আমরা ন্যায়, সুবিচার ও নিরপেক্ষতা ভুলে গিয়ে তা মানুষের মাঝে উপস্থাপন করব!পরিশেষে বলতে চাই, খ্রীষ্টান, মুসলমান, বৈদ্ধ, হিন্দু, ইয়াহুদি ও অন্যান্য ধর্মালম্বীরা সবাই সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি। পৃথিবী একটি বাসযোগ্য বাসস্থান, যাকে রত্ন ভান্ডার বললেও বোধয় কম বলা হবে! সবাই তার ধর্মে উচ্চ ও সবাই সম্মিলিত ভাবে সমান। সকলের জন্মস্থান এই সুন্দর পৃথিবী এবং সকলে একই জন ও স্থান থেকে উদ্ভুত। সুতরাং,মান সম্মান ও নিরপেক্ষতায় পুরো মানবজাতি সমান ও সমমর্যাদার। ভেদাভেদ যতই থাকুন না কেন সকলের উদ্দেশ্য সুমহান, সু্উচ্চ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশ। তবে মানুষের স্বার্থে ন্যায়,সুবিচার ও নিরপেক্ষতাকে প্রধান্য দিয়ে তবেই মনুষ্যজাতিকে এগিয়ে যেতে হবে। আর এই ত্যাগই হবে বিশ্ব শান্তির জন্য প্রধান উপকরন। তাই চলুন কবির ভাষায় বলি, “ভোগ নয় ত্যাগেই শান্তি এবং নির্যাতিতদের পক্ষে থাকাই হবে একমাত্র জয়ন্তি”।

লেখক- ওসি (তদন্ত)

পরশুরাম মডেল, থানা, ফেনী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*