,

কক্সবাজারে এইচআইভি সংক্রমণে আক্রান্ত ৩৯৫ রোহিঙ্গা, মৃত ১৯

ডেস্ক নিউজ : 

বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে এইডস সৃষ্টিকারী এইচআইভি ভাইরাস এবং নানা যৌন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে। কয়েক মাসে তাদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের বিস্তার লক্ষ্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সামাজিকতা ও রোগ সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে এ ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশ সরকার প্রকাশিত সর্বশেষ ডাটা অনুযায়ী, কক্সবাজারে বসবাসকারী শরণার্থীদের মধ্যে ৩৯৫ জন রোহিঙ্গা এই ভাইরাসে আক্রান্ত। এ বছর নতুন ১০৫ জনের ক্ষেত্রে এই ভাইরাস শনাক্ত করা হয়েছে। এ পর্যন্ত এইচআইভি সংক্রমণে মারা  গেছেন ১৯ জন। এ খবর দিয়ে অনলাইন ডয়েচে ভেলে বলেছে, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন সরকারি এই সংখ্যার চেয়ে আক্রান্তদের প্রকৃত সংখ্যা আরো অনেক বেশি হতে পারে। তারা সরকার ও কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে এই রোগের বিস্তার রোধে পদক্ষেপ নিতে।

রোহিঙ্গারা হলেন মিয়ানমারের জাতিগত সংখ্যালঘু মুসলিম। শতাব্দীর পর শতাব্দী তারা মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য রাখাইন, যা আরাকান নামেও পরিচিত, সেখানে বসবাস করছেন। তাদেরকে নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমার। উল্টো, বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও তাদের দোসররা এসব রোহিঙ্গার ওপর নৃশংস নির্যাতন চালিয়েছে। তা চরম আকার ধারণ করে ২০১৭ সালের ২৫শে আগস্ট। ওই সময় পুলিশ পোস্টে উগ্র আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মির (আরসা) সদস্যরা হামলা চালায়। এর ফলে বেশ কয়েকজন নিরাপত্তা রক্ষী নিহত হন। এর জবাবে নৃশংস জাতিনিধন শুরু করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। তার ফলে বাধ্য হয়ে কমপক্ষে ৭ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। এসব রোহিঙ্গাই কক্সবাজার উপকূলে গাদাগাদি করে বসবাস করছেন আশ্রয়শিবিরে।

রোহিঙ্গারা কক্সবাজারে আসার দু’-এক মাস পরেই বাংলাদেশ সরকার বেসরকারি সংগঠনগুলোর সহায়তায় রোহিঙ্গাদের মেডিকেল টেস্ট সম্পন্ন করে। এ সময় ৮৫ জনের দেহে এইচআইভি পাওয়া যায়। তারপর থকে এই সংখ্যা বাড়ছেই। মেডিকেল সায়েন্স বিষয়ক প্রকাশনা ‘ল্যান্সেট’ একটি জরিপ পরিচালনা করে। তাতে দেখা যায়, ২০১৮ সালের আগস্টে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে সরকারিভাবে ২৭৩ জনের দেহে এইচআইভি আছে বলে রেকর্ড করা হয়েছে। এই সংখ্যা ২০১৯ সালের ৮ই মার্চে এসে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৩১৯-এ। এক্ষেত্রে আরো অনেক মানুষের পরীক্ষা সম্পন্ন হয়নি। ৩১৯ জনের দেহে এইচআইভি ভাইরাস পাওয়া যাওয়ার পর ২৭৭ জন চিকিৎসা নেয়া শুরু করেছেন। মারা গেছেন ১৯ জন। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্প্রতি যে ডাটা প্রকাশ করেছে তাতে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৩৯৫ জন এইচআইভিতে আক্রান্ত। জনস্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এইচআইভির বিস্তারের নেপথ্যে রয়েছে অসচেতনতা। রয়েছে সামাজিক নানা কুসংস্কার। এসব মিলে পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। অন্য সব রক্ষণশীল সমাজের মতোই কারো দেহে এইচআইভি পাওয়া গেলে তাকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে।

তাদের ভয়, ওই ব্যক্তির দেহ থেকে এইচআইভি ছড়াতে পারে। আবার যাদের দেহে এই ভাইরাস পাওয়া গেছে তারা চিকিৎসা নিতে গড়িমসি করেন। কক্সবাজারে নিয়োজিত একজন চিকিৎসক মোহাম্মদ আবদুল মতিন এ কথা বলেছেন। আবার অনেক রোহিঙ্গা এইচআইভিকে জ্বর, ঠাণ্ডার মতো সাধারণ অসুস্থতা হিসেবে দেখে থাকেন বলে মনে করেন ঢাকাভিত্তিক পপুলেশন সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেইনিং সেন্টারে কর্মরত মেডিকেল অফিসার আসিফ হোসেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদেরকে এই রোগের ভয়াবহতা সম্পর্কে বোঝানো খুবই কঠিন। অনেক রোগী চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণই করেন না। বিশেষ করে যখন তারা যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ল্যান্সেট বলেছে, এই ভয়াবহতার আরো অবনতি থেকে প্রতিরোধ করতে কর্তৃপক্ষের উচিত অবিলম্বে রোহিঙ্গাদের মধ্যে এইচআইভি সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তাদের শারীরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনার বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করা। এতে আরো বলা হয়, বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবা খাতকে এমনভাবে শক্তিশালী করা উচিত, যাতে নতুন এইচআইভি রোগী শনাক্ত ও তাদেরকে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হয়। এইচআইভিকে অগ্রাধিকার দেয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকার এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক এজেন্সিগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার জন্য অনেক আন্তর্জাতিক এজেন্সি সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এসব সংগঠনও রোগীদের এইচআইভি শনাক্তে সহযোগিতা করছে। কিন্তু কয়েক লাখ শরণার্থীকে মানবিক সহায়তার পাশাপাশি এইচআইভি স্ক্রিনিং করার ক্ষেত্রে এসব তৎপরতা যথেষ্ট নয়। চিকিৎসক আবদুল মতিন বলেছেন, শরণার্থীদের এই ক্যাম্পে এইচআইভি স্ক্রিনিং সেন্টার বৃদ্ধি করা খুব বেশি প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*