,

টেকনাফে অপসাংবাদিকতা চরম পর্যায়ে!

pic-1-scaled.jpg

জসিম উদ্দিন টিপু : টেকনাফে আশংকাজনকহারে অপসাংবাদিকদের দৌরত্মে রীতিমত অতিষ্ট হয়ে পড়েছে সীমান্ত উপজেলার বিভিন্ন পেশার মানুষ। নামে বেনামে গলায় কার্ড ঝুলিয়ে যে সে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সীমান্তের অপরাধ চক্রের বাসিন্দারাও সাংবাদ পেশাকে পুজিঁ হিসেবে ব্যবহার করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। মাদক কারবারীরা কৌশলে তাদের লোকজন ঢুকিয়ে দিয়ে এই মহান পেশাকে কলুষিত করছেন। এখানে সিএনজি চালক, ইয়াবা কারবারী থেকে শুরু করে চায়ের দোকানদার পর্যন্ত এখন কার্ডধারী সাংবাদিক। এছাড়া ইয়াবা সংশ্লিষ্ট লোকজন মোটাংকের টাকার বিনিময়ে রাতারাতি সাংবাদিক বনে যাচ্ছে। বিষয়টি সংবাদ পেশার জন্য বড় ধরণের হুমকি বলে জানাগেছে। অপসাংবাদিকদের অনুপ্রবেশ এই পেশার জন্য এক ধরণের অশনি সংকেত জানিয়ে প্রকৃত সংবাদ সেবীরা সিনিয়র সাংবাদিকসহ প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। টেকনাফে সংবাদিকতার ৩৮বছরের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে। এখানকার অনেক সাংবাদিক কক্সবাজার জেলা শহরে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তারা প্রতিনিয়ত তাদের যোগ্যতার প্রমাণ দিচ্ছেন। আগের ৩২ বছরে সংবাদ সেবীর যেসংখ্যা ছিল। বিগত ৫/৬বছরে সে সংখ্যা ৩গুণেরও বেশী হয়েছে। এক চারণ সাংবাদিকের মতে, পৃষ্টপোষকতা এবং অপরাধকর্ম আড়াল করতেই বেকার এবং অযোগ্য লোকেরা টেকনাফের সংবাদ পেশায় যুক্ত হয়েছেন।
এই ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক সংবাদকর্মী জানান,পুরান রোহিঙ্গা সুযোগ নিতে এবং দেশীয় নাগরিক হিসেবে সনদ নিয়ে অনেকে এই পেশায় প্রবেশ করেছে। দলাদলী ও গ্রæপিং করার সুযোগে এসব রোহিঙ্গা নাগরিকদের পাশাপাশি এলাকার বিভিন্ন মামলার আসামী,ইয়াবা কারবারীরা টাকার বিনিময়ে প্রেসকার্ড এনে গলায় ঝুলিয়ে মোটর বাইক নিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এসব সংবাদ এজেন্সীর নিয়োজিত কর্মীর বেতন কত আর তাদের ব্যয় কত তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে যায়। তাদের সংসার চালানোর বৈধ আয়ের উৎস কি তা খতিয়ে দেখলে সব অপকর্ম আয়নার মতো স্পষ্ট হয়ে উঠবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এদিকে টেকনাফ প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা জানান, ২০১৩ সনের শেষের দিকে মাদক বিরোধী অভিযান শুরু হয়ে ২০১৮সনে মাদকের বিরুদ্ধে প্রশাসনের জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন দেখেই টেকনাফে রীতিমত হুমড়ি খেয়ে সংবাদ পেশায় অনেক অনুপ্রবেশ ঘটেছে। এর আগে এত লোক সংবাদ পেশায় আসেনি। অনুপ্রবেশকারী কথিত সাংবাদিকরা মাদকসহ যাবতীয় অপরাধ কর্মে পৃষ্টপোষকতা দিতে এই পেশায় এসেছেন। যা খুবই দুঃখজনক।
অনুসন্ধানে জানাগেছে,টেকনাফে সংবাদ পেশায় কাজ করছে প্রায় ১শ কাছাকাছির লোক। জেলা থেকে প্রকাশিত ২২টি পত্রিকায় অন্তত ৩জন করে প্রতিনিধি, ১জন করে জাতীয় পত্রিকার সংবাদদাতা, অনলাইন, নিয়মিত-অনিয়মিত এবং কপি পেষ্ট মিলে এই সংখ্যা আরো অনেক বেশী হবে। যাছাই বাছাই না করে যাকে তাকে প্রতিনিধি নিয়োগ পূর্বক সংবাদিক কার্ড দিয়ে এই পেশাকে বেশীর ভাগ কলংকিত করছেন কিছু সম্পাদক। যা এই পেশাকে ক্রমশ প্রশ্নের সম্মুখীন করে তুলছে। বিষয়টি নিয়ে এখন হতেই চিন্তা-ভাবনা করা দরকার।
খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, আশির দশকের শুরুতেই টেকনাফে প্রথম সংবাদ পেশা শুরু করেন এক মাদ্রাসা শিক্ষক। তিনি হাফেজ মুহাম্মদ কাশেম। ১৯৮১ সনে সাপ্তাহিক কক্সবাজার বার্তা দিয়ে হাফেজ কাশেম সাংবাদ পেশায় আসেন। পরবর্তীতে দৈনিক মিল্লাত দিয়ে সংবাদ পেশা শুরু করেন মুহাম্মদ ছৈয়দ হোছাইন। ১৯৯৩সনে হাফেজ মুহাম্মদ কাশেম, আব্দুল কুদ্দুস রানা, আশেকুল্লাহ ফারুকী, উত্তর বঙ্গের গিয়াস উদ্দিন শিমুলসহ ৬ সদস্য নিয়ে মুহাম্মদ ছৈয়দ হোছাইন টেকনাফ প্রেসক্লাব প্রতিষ্টা করেন। বর্তমানে টেকনাফ প্রেসক্লাবের সদস্য সংখ্যা ৪গুণ।
কক্সবাজারের চারণ সাংবাদিক ও চ্যানেল টোয়েন্টি ফোরের জেলা সংবাদদাতা কবি নুপা আলম জানান, মাদকের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক অভিযান শুরু হওয়ায় মাদক সংশ্লিষ্ট লোকজন কৌশলে তাদের নিকটাত্মীদের এই মহান পেশায় ঢুকিয়ে দিয়ে কূলষিত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। তাদেরকে চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবী জানিয়ে তিনি এসব অপসাংবাদিকদের বয়কটের আহবান জানান। টেকনাফ প্রেসক্লাবের প্রতিষ্টাতা সভাপতি আলহাজ্ব মুহাম্মদ ছৈয়দ হোছাইন জানান, যারা সাংবাদিকতার নাম দিয়ে ইয়াবা ব্যবসা করবে,তারা কখনো এ পেশায় আসতে পারবেন না। তবে,চিহ্নিত যারা ইতিমধ্যে এই পেশায় অনুপ্রবেশ করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে তিনি আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান। কক্সবাজারের সিনিয়র সাংবাদিক ও দৈনিক কালের কন্ঠের বিশেষ প্রতিনিধি তোফায়েল আহমদ জানান,রাজনৈতিক এবং ইয়াবা কারবারকে বাঁচানোর জন্য সাংবাদ পেশায় আসাটা খুবই গর্হিত কাজ। তিনি ইয়াবার মত সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার উপর গুরুত্বারোপ করেন। ইয়াবার প্রবেশদ্বার পয়েন্টে সাংবাদিকতার নামে অপরাধীদের দৌরত্ম বেড়েই চলছে জানিয়ে এই সাংবাদিক নেতা অপসাংবাদিকতা প্রতিরোধে সমাজের সচেতন ব্যক্তিদেরও এগিয়ে আসার আহবান জানান। সুপ্রীম কোর্টের তরুণ আইনজীবী এড: মনিরুল ইসলাম জানান,সাংবাদিকতা করতে নূন্যতম শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং সুনির্দিষ্ট নীতিমালা করলেই আপনা আপনি অপসাংবাদিতা বন্ধ হয়ে যাবে। জেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও হোয়াইক্যং আলী আছিয়া স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ মোস্তাফা কামাল চৌধুরী মুসা জানান, কিছু কিছু স্থানীয় পত্রিকার সম্পাদকদের দায়িত্ব জ্ঞানহীনতার কারণে প্রকৃত অর্থে অপসাংবাদিকতা বাড়ছে। প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান নেই,শব্দের গাঁথুনি এবং বাক্যের গঠন জানেন না তারাও সাংবাদিক। এরা সাংবাদিকতার নামে নিজেদের স্বার্থে বিশেষ মহলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। অপসাংবাদিকতা প্রতিরোধে তিনি জনসচেতনতা বৃদ্ধির উপর গুরুত্বারোপ করেন।
এদিকে জানতে চাইলে টেকনাফ প্রেসক্লাবের উপদেষ্টা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, সাংবাদিকতার নামে অপকর্মে জড়িতদের কোন ধরণের সুযোগ দেওয়া হবেনা। মহান এই পেশাকে কলুষিতকারীদের বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন বলে জানান। #

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*