,

রোহিঙ্গদের গ্রামগুলো গুড়িয়ে দিয়েছে মিয়ানমার, হচ্ছে সরকারি স্থাপনা

ডেস্ক নিউজ ::

বাংলাদেশে আশ্রয় রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবার্সন নিয়ে যখন চলছে আলোচনা, তখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে এলে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের ভিন্ন চরিত্র। মুসলিম রোহিঙ্গাদের হাজার হাজার গ্রাম গুঁড়িয়ে দিয়ে সেখানে পুলিশ ব্যারাক, সরকারি ভবন ও শরণার্থী ক্যাম্প নির্মাণ করা হয়েছে।

সরেজিমন পরির্দশন করে এমন চিত্র দেখতে পেয়েছেন বিবিসির দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক প্রতিনিধি জোনাথন হেড। মিয়ানমার সরকারের ব্যবস্থাপনায় কয়েক দিন আগে বিদেশি সাংবাদিকদের একটি দলকে উত্তর রাখাইনের কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখার সুযোগ দেওয়া হয়।

তিনি বলেছেন, মিয়ানমার সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে তাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ফেরত যাওয়ার ইচ্ছাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কারণ, বর্তমান গৃহীত ব্যবস্থায় তাদেরকে আটকে রাখা হবে ট্রানজিট ক্যাম্পে। হাতেগোনা অল্প কিছু সংখ্যক রোহিঙ্গা তাদের মূল বসতি বা সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে যেতে সক্ষম হতে পারেন।

জোনাথন হেড লিখেছেন, সরকারি সফরে বিবিসি চারটি এলাকা দেখতে পেয়েছে, যেখানে নিরাপত্তা বিষয়ক অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। এসব স্থান এক সময় স্যাটেলাইটের ছবিতে দেখা গিয়েছিল রোহিঙ্গাদের বসতি।

জোনাথন হেড সেখানে অন্তত চারটি জায়গায় নতুন গড়ে তোলা নিরাপত্তা স্থাপনা দেখেছেন, যেসব জায়গায় এক সময় রোহিঙ্গাদের গ্রাম থাকার প্রমাণ পাওয়া যায় স্যাটেলাইট ইমেজে। তবে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গা গ্রামের জায়গায় স্থাপনা নির্মাণের বিষয়টি অস্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।

তিনি আরও লিখেছেন, রাখাইনে প্রবেশাধিকার স্বাভাবিকভাবেই কঠোর বিধিনিষেধে আটকানো। আমরা সরকারি একটি গাড়িবহরে করে সেখানে সফরে গেলাম। পুলিশের তদারকি ছাড়া কোনো মানুষের ছবি তোলা ও সাক্ষাৎকার নেয়ার অনুমোদন দেয়া হয়নি আমাদের। কিন্তু আমরা পরিষ্কারভাবে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে ইচ্ছাকৃতভাবে নির্মূল করে দেয়ার সুস্পষ্ট প্রমাণ দেখতে সক্ষম হয়েছি। স্যাটেলাইটে পাওয়া ছবির বিশ্লেষণ করেছে অস্ট্রেলিয়ান স্ট্রাটেজিক পলিসি ইন্সটিটিউট। তাতে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের নৃশংসতায় রোহিঙ্গাদের যেসব গ্রাম ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল তার মধ্যে শতকরা কমপক্ষে ৪০ ভাগ পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়েছে।

মিয়ানমারে বিবিসি কি দেখেছে?

সরকারি ব্যবস্থাপনায় আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হলো হ্লা পেয়ে কাউং ট্রানজিট ক্যাম্পে। এখানে ২৫,০০০ শরণার্থীকে রাখা যাবে বলে তারা জানিয়েছে। বলা হয়েছে, স্থায়ী আবাসনে পাঠানোর আগে রোহিঙ্গাদেরকে এই ট্রানজিট ক্যাম্পে অবস্থান করতে হবে দু’মাস। প্রায় এক বছর আগে এই ট্রানজিট ক্যাম্প নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। তবে এর অবস্থা খুবই নাজুক। নির্মিত টয়লেটগুলো ভেঙে পড়েছে। রোহিঙ্গাদের দুটি গ্রাম হাও রি তু লার এবং থার জাই কোনে’র পাশে নির্মাণ করা হয়েছে এই ক্যাম্প। ওই গ্রাম দুটি ২০১৭ সালের নৃশংসতার পরে ভেঙে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়েছে।

জোনাথন হেড আরও লিখেছেন, যখন আমি ক্যাম্প প্রশাসক সোয়ে শয়ে অংয়ের কাছে জানতে চাইলাম, কেন এসব গ্রাম ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে? জবাবে তখন তিনি গ্রাম নিশ্চিহ্ন করার কথা প্রত্যাখ্যান করলেন। কিন্তু তাকে আমি স্যাটেলাইটে পাওয়া ছবিগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলাম। তিনি তখন আমাকে বললেন, অতি সম্প্রতি তিনি এখানে কাজে যোগ দিয়েছেন। এসব প্রশ্নের উত্তর তিনি দিতে পারবেন না।

আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হলো পুনর্বাসন বিষয়ক ক্যাম্প কিয়িন চাউংয়ে। জাপান ও ভারত সরকারের অর্থায়নে এই ক্যাম্প নির্মাণ করা হয়েছে। শরণার্থীরা ফিরে গেলে তাদের জন্য দীর্ঘস্থায়ী আবাসন হবে এটি। কিন্তু এই ক্যাম্পটি নির্মাণের জন্য জমি পরিষ্কার করতে বুলডোজার দিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে ফেলা হয়েছে মিয়ার জিন গ্রাম। এই ক্যাম্পটি বর্ডার গার্ড পুলিশের জন্য নির্মিত একটি নতুন বিশাল আকারের ব্যারাকের খুব কাছেই। উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের একটি ইউনিট এই বর্ডার গার্ড পুলিশ। ক্যামেরার আড়ালে কর্মকতারা ওই মিয়ার জিন গ্রামটি ধ্বংস করে দেয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন।

মূল শহর মংডুর ঠিক বাইরে মিও থু গাইই। এক সময় এখানে বসবাস করতেন কমপক্ষে ৮,০০০ রোহিঙ্গা। সরকারি একটি গাড়িবহরে করে অতিক্রম করে যাওয়ার সময় ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে আমি এই গ্রাম চিত্রায়ন করেছিলাম। এই গ্রামের বহু বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। বড় বড় দালানগুলো তখনও অক্ষত দাঁড়িয়ে। রাখাইন গ্রামকে ঘিরে রাখা গাছগুলোও ছিল। কিন্তু এখন সেই এলাকা অতিক্রম করার সময় দেখা গেল সরকারি বিশাল বিশাল সব ভবন, পুলিশ কমপ্লেক্স। সেই গাছগুলো আর নেই।

জোনাথন হেড লিখেছেন, আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হলো ইন ডিন গ্রামে। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে এই গ্রামের ১০ জন মুসলিমকে আটক করে তাদেরকে গণহত্যা করা হয়। এ ঘটনা সারাবিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে। মিয়ানমারে নৃশংসতার বিষয়ে সেনাবাহিনী যা দু’একটা ঘটনার কথা স্বীকার করেছে তার মধ্যে এটি অন্যতম। ইন ডিন গ্রামের চারভাগের তিনভাগই মুসলিম। বাকিরা রাখাইন বৌদ্ধ। কিন্তু এখন ওই গ্রামে একজন মুসলিম বা তার বাড়ি খুঁজে পাওয়া যাবে না। সেখানে রাখাইনদের বসতিগুলো এখন শান্ত ও শান্তিপূর্ণ। কিন্তু যেখানে রোহিঙ্গাদের বাড়িগুলো ছিল, যখন আপনি সেখানে পৌছাবেন, দেখবেন গাছগুলো উধাও হয়ে গেছে। তার পরিবর্তে গড়ে উঠেছে কাঁটাতারের বেড়া। এই বেড়া নতুন করে গড়ে উঠা বর্ডার গার্ড পুলিশ ব্যারাককে বেষ্টন করে আছে। সেখানে রাখাইন বৌদ্ধ অধিবাসীরা আমাদেরকে বলেছেন, তাদের পাশাপাশি তারা আর কখনো মুসলিম বসতি মেনে নেবেন না।

মতামত...