,

টেকনাফের ছোট নৌকার জেলেদের বড় বিপদ

ডেস্ক নিউজ :

বিশ্বের দীর্ঘতম কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের পাশে ৮৪ কিলোমিটারের দৃষ্টিনন্দন মেরিন ড্রাইভ সড়ক। সড়কের ওপর এবং পশ্চিম পাশে (সমুদ্রের দিকে ঝাউবাগানের কাছে ) সাজানো অবস্থায় পড়ে আছে শত শত রঙিন নৌকা। স্থানীয় লোকজন বলেন ‘ডিঙি নৌকা’। ভ্রমণে আসা পর্যটকেরা নৌকার পাশে দাঁড়িয়ে তুলছেন ছবি কিংবা সেলফি। নৌকাগুলো বিনোদনের খোরাক মেটালেও নৌকার মালিক ও জেলেশ্রমিকেরা আছেন মহাবিপদে। ১ মাস ধরে জেলেরা সাগরে মাছ ধরতে না পারায় আর্থিক টানাপোড়েনে সময় পার করছেন। সরকারি নিষেধাজ্ঞায় গত ২০ মে থেকে টানা ৬৫ দিনের জন্য সাগরে মাছ ধরা বন্ধ কর্মসূচি চলছে। এতে টেকনাফ উপজেলার তিন হাজার নৌকার অন্তত ৪০ হাজার জেলে বেকার হয়ে পড়েছেন। পাশের উপজেলা উখিয়ারও কয়েক হাজার জেলে পরিস্থিতির শিকার।
জেলেরা বলেন, গত রোজার ঈদে মৎস্য বিভাগ নিবন্ধিত জেলার ৪৬ হাজার জেলে পরিবারে সরকারিভাবে ৪০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়। এর মধ্যে টেকনাফের সাত হাজার জেলেও ছিলেন। তবে ছোট নৌকার আরও অন্তত ৪০ হাজার জেলে ত্রাণসহায়তা পাননি। তাঁদের ঈদ কেটেছে চরম কষ্টে। আগামী আরও এক মাস সাগরে মাছ ধরা বন্ধ থাকবে। তখন জেলেদের কী অবস্থা হবে এই ভেবে পরিবারগুলো চরম শঙ্কার মধ্যে।
রোববার দুপুরে মেরিন ড্রাইভ সড়কের টেকনাফের মহেশখালীয়াপাড়া অংশে গিয়ে দেখা গেছে, সড়কের পাশে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে কয়েক শ রঙিন নৌকা। পাশের ঝাউবাগানের ভেতরে রাখা হয়েছে অসংখ্য নৌকা। নৌকায় কোনো জেলে নেই। নেই মাছ ধরার জাল। ৫-৭টা নৌকা মিলে পাহারা দিচ্ছেন একজন করে জেলে। বিকেলে উখিয়ার রেজুখালের রেজুব্রিজ এলাকায় দেখা গেছে শতাধিক নৌকা।
মহেশখালীয়াপাড়ার জেলে আবুল কালাম (৪০) বলেন, ডিঙি নৌকাগুলো সমুদ্রের এক কিলোমিটারে গিয়ে ছোট আকৃতির লইট্যা, পোপা, ছুরি, ছিটকিরি, ফাইস্যা, চিংড়ি, বাটামাছ ধরে আনা হয়। দিনের বেলায় ধরা হয় এসব মাছ। তারপর বালুচরে বিক্রি হয় মাছগুলো। ৮০ শতাংশ মাছ টেকনাফ, উখিয়া ও কক্সবাজার শহরের হাটবাজারে বিক্রি হয়। স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে কিছু মাছ সরবরাহ হয় চট্টগ্রাম ঢাকায়। এখন এক মাস ধরে মাছ ধরা বন্ধ থাকায় স্থানীয় হাটবাজারে মাছের তীব্র সংকট চলছে। অন্যদিকে বেকার জেলেদের হাহাকার অবস্থা।
টেকনাফ নৌকা মালিক সমিতির উপদেষ্টা ও সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক ইউপি সদস্য সুলতান আহমদ বলেন, এ সমিতির আওতায় দেড় হাজার ডিঙি নৌকা আছে। সমুদ্রের একেবারে তীরে নৌকার জেলেরা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তবে ৫০ থেকে ১০০ কিলোমিটার গভীর সাগরে গিয়ে ইলিশ, কোরাল, রুপচান্দা, লাক্ষাসহ বড় মাছ ধরে কক্সবাজারের আরও পাঁচ হাজার ট্রলার। গভীর সাগরে মৎস্য ভান্ডার সমৃদ্ধ করতে ভারী ট্রলারগুলোর ৬৫ দিন মাছ ধরা বন্ধ ঘোষণা দিয়েছে সরকার। কিন্তু উপকূলের ডিঙি নৌকাগুলো নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত করায় উপকূলের দরিদ্র জেলেরা হতাশ।
নৌকা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নুর মোহাম্মদ গণি বলেন, ‘টেকনাফের ৪০ হাজার জেলের দুরবস্থার চিত্র তুলে ধরে গত ২৬ মে কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে আমরা স্মারকলিপি পাঠিয়েছিলাম। এ পর্যন্ত সাড়া মেলেনি।’ এর আগে কক্সবাজার শহর ও টেকনাফ পৌরসভা এলাকায় ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে টেকনাফ উপকূলের ক্ষুদ্র নৌকার জেলেদের মাছ ধরার সুযোগ দাবি করে জেলেরা মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত জেলেরা মাছ ধরার অনুমতি পাননি।
জেলেরা বলেন, ৬৫ দিন সাগরে মাছ ধরা বন্ধ থাকলে উপকূলের হাজারো জেলে পরিবারে বিপর্যয় নেমে আসবে। কয়েক লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর চাপে নাকাল টেকনাফে জেলেদের মাছ ধরা ছাড়া বিকল্প কোনো কাজও নেই।
টেকনাফ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল আলম বলেন, ইয়াবা চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকানোর লক্ষ্যে ২০১৭ সালের ৩ এপ্রিল থেকে গত দুই বছর টেকনাফের নাফ নদীতে জেলেদের মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়েছে। এখন সমুদ্র উপকূলের কাছাকাছিতে দৈনিক ভিত্তিতে ডিঙি নৌকার জেলেদের মাছ ধরাও বন্ধ আছে। এতে ৪০ হাজার জেলে পরিবারে অভাব-অনটন ও হতাশা দেখা দিয়েছে।
টেকনাফ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, সরকারি সিদ্ধান্তে মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়েছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশরাফুল আফসার বলেন, নাফ নদীতে মাছ ধরার বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসছে। শিগগিরই জেলেরা মাছ ধরতে পারবেন।

সুত্র- সিবিএন

মতামত...