,

টেকনাফে বাড়িতে বাড়িতে হুন্ডি : সরকার হারাচ্ছে রেমিট্যান্স


মো. আশেক উল্লাহ ফারুকী / মুহাম্মদ জুবাইর, টেকনাফ:
বাংলাদেশের অন্যতম রেমিট্যান্স অর্জনকারী উপজেলা হচ্ছে টেকনাফ। এই এলাকার বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠী প্রবাসী। আর ঈদকে সামনে রেখে টেকনাফে মায়ানমার ভিক্তিক হুন্ডি ব্যবসায়ীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এমন অভিযোগ সাধারন জনগণের। বৈধ পথে এসব টাকা না পাঠিয়ে প্রবাসী প্রতিনিয়ত টাকা পাঠাচ্ছে অবৈধ হুন্ডি ব্যবসায়ীদের হাতে। আর প্রশাসনের চোখের আড়ালে ব্যাপকহারে চলছে বাড়িতে বাড়িতে জমজমাট হুন্ডি ব্যবসা। সীমান্ত অঞ্চলে অত্যন্ত পুরনো অবৈধ ব্যবসা হিসাবে খ্যাত এটি। এ ব্যবসা যদিও অবৈধ কিন্তু টেকনাফে অবাধে চলছে যুগ-যুগ ধরে। এছাড়া মায়ানমারের অধিকাংশ রোহিঙ্গা নাগরিক ও প্রবাসে রয়েছে। তাদের কোন ব্যাংক একাউন্ট এবং বৈধ ভাবে সে দেশে লেনদেন করতে কোন ব্যাংক নেই, ফলে তাদের একমাত্র ভরসা হুন্ডির উপর। টেকনাফ উপজেলাটি মায়ানামারের সীমানা ঘেষা হওয়ায়, সে দেশের অনেক হুন্ডি ব্যবসায়ী দেশীয় ব্যবসায়ীদের সাথে আঁতাত করে নির্বিগ্নে কোটি কোটি টাকা মায়ানমারে পাচার হয়ে যাচ্ছে এবং বিনিমিয়ে আসছে মরন নেশা মাদক ও স্বর্ণ। এমন গুরুত্বর অভিযোগ অনেকের। এমনকি টেকনাফে কতিপয় ব্যাংক হুন্ডি ব্যবসায়ীদের সাথে সখ্যতা থাকায় এসব টাকা সহজেই পাচার হয়ে যায়।
সীমান্ত শহর টেকনাফ উপজেলায় ১টি পৌরসভা ও ৬টি ইউনিয়নের প্রবাসী শ্রমজীবি মানুষ সৌদিআরব, দুবাই, কাতার, বাহরাইন, ওমান, সিঙ্গাপুর ও মালেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে চাকুরীসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থেকে প্রবাস জীবনযাপন অতিবাহিত করছে। এসব প্রবাসী সাংসারিক খরচসহ নানা প্রয়োজনে দেশে টাকা পাঠান। নিয়মানুসারে প্রাবাসীরা ব্যাংকের মাধ্যমে তাদের অর্থ দেশে পাঠানোর কথা। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে সারাদিন হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করে সেখানে দেশে টাকা পাঠাতে লাইনে দাঁড়িয়ে ড্রাফট বানাতে বিড়ম্বনা পোহাতে হয় । ফলে নানামুখী বিড়ম্বনা ও হয়রানির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রবাসীরা হুন্ডিকে অর্থ প্রেরণের সহজ মাধ্যম হিসাবে বেছে নেয়।
হুন্ডি ব্যবসার মাধ্যমে টেকনাফের প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা লেনদেন হলেও সরকারের কোষাগারে এক কানাকড়িও রাজস্ব জমা পড়ছেনা। এ ধরণের হুন্ডি ব্যবসা চলতে থাকলে সরকার হারাবে বিপুল পরিমান রাজস্ব আর প্রতারিত হবে প্রবাসী পরিবারের লোকজন। হুন্ডি ব্যবসায়ীরা এ এলাকাকে হুন্ডির স্বর্গরাজ্যে পরিনত করেছে। হুন্ডি ব্যবসার সাথে যারা জড়িত তারা কুয়েত ও সৌদি আরবসহ মধ্য প্রাচ্যে থেকে হুন্ডি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। জনশ্রুত অনুযায়ী টেকনাফে ২০/২৫ জনের হুন্ডি ব্যবাসীয়ীদের নাম বিশেষ সূত্র প্রকাশ রয়েছে। যেসব সূত্র থেকে যানা গেছে তারাই প্রতিমাসে এসব হুন্ডি কারবারিদের মাধ্যমে দেশে টাকা পাঠায়। যারা যানিয়েছে তারা কেউ নিজেদের নাম প্রকাশে আগ্রহী নয়। আর হুন্ডির মাধ্যমে টাকা দিলে ঘরে বসে সহজেই পাওয়া যায়।
শাহপরীর দ্বীপ এলাকার এক নারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আগে প্রবাস থেকে স্বামী ব্যাংকে টাকা দিতো, টাকা আনতে গেলে অনেক কষ্ট হয়। এখন আমার প্রবাসে থাকা স্বামী টাকা কার কাছে জানি দেয় সে প্রতিমাসে টাকা বাড়িতে এসে দিয়ে যায়।
এসব হুন্ডি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে গোপন সমঝোতার কথাও মানুষের মুখে মুখে প্রচারিত রয়েছে। রয়েছে দায়িত্বশীল প্রশাসনের সঙ্গে বোঝাপরা। দায়িত্বশীল প্রত্যেকের সঙ্গে সুসম্পর্কের কারণে হুন্ডি ব্যবসায়ী চক্র দেদারসে ব্যবসা করছে বলেও খবর প্রচারিত আছে। গুটি কয়েক হুন্ডি ব্যবসায়ীদের হাতে বর্তমানে টেকনাফ অঞ্চলের অধিকাংশ জনগণ নির্ভর হয়ে পড়েছে। আমাদের দেশে আমদানী ও রপ্তানী ব্যয়ে যে ঘাটতি থাকে তার জন্য সহায়ক হিসেবে কাজ করে প্রবাসী আয়। পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, প্রতি বছরই রপ্তানীর থেকে আমদানি বেশি হয়। সেই ঘাটতির অর্থায়নে যায় প্রবাসীদের অর্থ। হুন্ডিবাজ মহারাজরা ঘুণেধরা পোকার মতো ভিতর হতে খেতে খেতে অর্থনীতির সর্বনাশ করছে। যারা এ অপরাধের সাথে জড়িত তারা দেশ ও জাতির শত্রু। তাদের বিরুদ্ধে বহু আগেই সাঁড়াশি অভিযান চালানো বাঞ্ছনীয় ছিল। এরাই প্রবাসীদেরকে প্রভাবিত করে অবৈধভাবে বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণে উদ্বুদ্ধ করে থাকে। স্থানীয়দের অভিযোগ প্রশাসনের সাথেও এলাকার হুন্ডি ব্যবসায়ীদের রয়েছে গভীর সম্পর্ক।
তাই হুন্ডি ব্যবাসায়ীরা খুব সহজেই আইনের ফাঁক থেকে পার পেয়ে যাচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরী হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সচেতন মহল।
টেকনাফ মডেল থানার (ওসি) তদন্ত এসবি এম স দোহা বলেন, হুন্ডি ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। এবং সরকারের মানি লন্ডারিং ও মাদক প্রতিরুধে জিরো ট্রলারেন্স নীতির প্রতি অটল থাকবো।

মতামত...