,

নাফ পারে আর্তনাদ, ভিক্ষা চাইনা, মাছ শিকার করে বাঁচতে চাই

আমান উল্লাহ কবির, টেকনাফ ::

নীলকান্ত জলদাস (৬৬)। বিবেক বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে মাছ শিকার করে তাঁর জীবন যাত্রা শুরু করে। এ বয়স পর্যন্ত অন্য কোনো কাজই করেননি তিনি। শুধুমাত্র মাছ শিকারই তাঁর পেশা ও নেশা। পেশাকে পুঁজি করে সংসার চালাতেন। পরবর্তীতে বিয়ে করেন এবং ছেলে মেয়েকে বড় করে বিয়েও করান। শুধুমাত্র একটিমাত্র পেশা মাছ শিকার। কিন্তু হঠাৎ করে ২০১৭ সালের আগস্টের দিকে নাফ নদী মাছ শিকার বন্ধ হওয়ায় অভাব অনটের দিন পার করছেন নীলকান্ত। বর্তমানে শোকে দুঃখে মুহ্যমান। একবেলা খেতে পারলেও অপর বেলায় উপোস থাকতে হচ্ছে। নীলকান্ত টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিযনের জেলাপাড়ার মহিন্দ্র জলদাসের ছেলে। তিনি নয়, তার পূর্বপুরুষ (বাপ দাদা) এ পেশায় নিয়োজিত থেকে মারা গেছেন। তাই তিনি এ পেশা ছাড়তে পারবেননা বলে জানান নীলকান্ত।
স্থানীয় পুলিন দাসের ছেলে বামহন্দ দাস (৫৫) বলেন, প্রায় দুই বছর সময় ধরে নাফ নদীতে মাছ শিকার করতে পারছিনা। এতে হাজার টাকা লোন নিয়ে নৌকা ও জাল তৈরীতে ব্যায় এই টাকাও শোধ করা কষ্ট সাধ্য হয়ে পড়েছে। ছেলে মেয়েদের দু’মুঠো বাদ পেট ভরে খাওয়া দূরহ হয়ে উঠেছে। ছেলে মেয়েদের লেখা পড়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। পাশাপাশি নৌকা ও জাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। রুজি রুজগারের উপকরণ নষ্ট হলে আত্মহত্যা ছাড়া কোনো পথ থাকবেনা। সত্য দাশের স্ত্রী জলদাস বলেন, রোহিঙ্গারা এ দেশে অবাধ বিচরণ করতে পারে। কিন্তু আমরা পারছিনা। তাদের কারণে আমাদের মৌলিক অধিকার হরণ ও ক্ষুন্ন হচ্ছে। এটাতো হতে পারেনা। আমরা এর সুষ্ঠু প্রতিকার চাই বলে জানান তিনি। ওই তিনজনই নয়, নাফ নদী নির্ভল হাজারো জেলে দীর্ঘ প্রায় দুই বছর ধরে প্রশাসন নাফ নদীতে মাছ শিকার বন্ধ রেখেছে বলে জানান।

সরেজমিন জানা যায়, যুগ যুগ ধরে জেলে পেশায় নিয়োজিত থেকে নাফ নদে মাছ শিকার করে জীবীকা নির্বাহ করে আসসে। কিন্তু রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ও ইয়াবা পাচারের অজুহাত তুলে প্রায় আড়াই বছর ধরে মাছ শিকার বন্ধ রাখা হয়েছে। অথচ লাখ লাখ রোহিঙ্গা ইতিমধ্যে আমাদের দেশে ঠাঁই হয়েছে। প্রতিদিন ইয়াবা ঢুকছে সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে। যা মিডিয়ায় প্রকাশ হচ্ছে। জেলেদের মাধ্যমে যদি যদি ইয়াবা পাচার হয়ে থাকে তাহলে রাতের বেলায় না হলেও অন্তত দিনের বেলায় নাফ নদে মাছ শিকারের অনুমতি দেওয়া হউক। তবে দু’মুঠো ভাত সুখে শান্তিতে খেতে পারব।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইয়াবা ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের অজুহাতে টেকনাফের নাফ নদীতে মাছ শিকার বন্ধ থাকায় অর্ধাহারে অনাহারে জীবন কাটাচ্ছেন প্রায় ১০ হাজার জেলে। গত আড়াই বছর পূর্বে মিয়ানমারের রাখাইনে সহিংসতার ফলে রোহিঙ্গারা দলে দলে এদেশে পালিয়ে আসার প্রেক্ষিতে অঘোষিত ভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে জেলেদের মাছ শিকার। একটানা মাছ শিকার বন্ধ থাকার ফলে নাফ নদ নির্ভর জেলে পরিবারগুলোতে নেমে আসে দূর্দশা। বিকল্প কোন আয়ের উৎস না থাকায় জেলে পরিবারের মধ্যে চলছে হাহাকার।

টেকনাফে বেশ কয়েকটি জেলে পাড়া রয়েছে। এরমধ্যে হোয়াইক্যংয়ের, উত্তরপাড়া, খারাইংগ্যাঘোনা, বালুখালী লম্বাবিল, হ্নীলার হোয়াব্রাং, নাটমুড়া পাড়াস্থ জেলে পাড়া, জাদীমুরা, খারাংখালী, টেকনাফের জাইল্যাপাড়া, কায়ুকখালী পাড়া, নাজির পাড়া, সাবরাংয়ের চৌধুরীপাড়া, নয়াপাড়া, শাহপরীরদ্বীপের জাইল্যা পাড়া, খারিয়াখালী, মাঝের পাড়া অন্যতম।

এব্যাপারে টেকনাফ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ দেলোয়ার হোসেন জানান, জেলেদের পরিবারে গত নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে ৪০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জেলেদের জন্য ইকো ফিস নামে একটি সংস্থা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
২ ব্যাটালিয়নের বিজিবি অধিনায়ক লেঃ কর্ণেল সরকার মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান জানান, রাষ্ট্রের নির্দেশনার কারণে নাফ নদে কোন মতেই মাছ শিকার করতে দেওয়া যাবেনা। সরকারের নিদের্শ আগের মতোই বলবৎ থাকায় এখন পর্যন্ত নাফ নদীতে মাছ শিকারের কোনো সুযোগ নেই। মাদক বা ইয়াবা পাচার প্রতিরোধে বিজিবি সর্বদা জিরো টলারেন্স নীতিতে রয়েছে। টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ রবিউল হাসান জানান, নাফ নদীতে বেশ কিছুদিন ধরে মাছ শিকার বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চিঠির উত্তরে দিনের যে কোন সময় মাছ শিকারের ব্যবস্থা করে দেওয়ার সুপারিশ করে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি এনজিওগুলোকেও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে মৎস্যজীবীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্যে।

মতামত...