,

অভিন্ন সাত দাবি ও ১১ লক্ষ্যের ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ঘোষণা

আলো নিউজ ডেস্ক ::

বর্ষিয়ান আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের যাত্রা শুরু হয়েছে। সন্ধ্যায় জাতীয় প্রেসক্লাবে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সন্মেলনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া হয়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে একটি অবাধ ও সুষ্টু নির্বাচনের দাবিতে রাজনৈতিক দলগুলো যুগপৎ আন্দোলনের জন্য জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ঘোষণা দেয়।

ড. কামাল হোসেনের সভাপত্বিতে আয়োজিত সংবাদ সন্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না। সংবাদ সন্মেলনে মির্জা ফখরুল ইসলামের নেতৃত্বে বিএনপিও অংশ নেয়।
সংবাদ সন্মেলনের শুরুতে ড. কামাল হোসেন বলেন, গত তিনদিনের টানা বৈঠক শেষে আমরা একটি ঐক্যমতে পৌঁছেছি। জনগণের স্বার্থেই আজকের এই জাতীয় ঐক্য। একক কোনো স্বার্থে এ ঐক্য হচ্ছে না।

কোটি কোটি জনগণের পক্ষে আমরা উদ্যোগ নিয়েছি।

এতে লিখিত বক্তব্যে মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, দেশে আজ দু:সহ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জনগণের ওপর সিন্দাবাদের ভুত চেপে বসেছে। সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধ না হলে এই লড়াইয়ে জেতা যাবে না।  এ সময় তিনি ঐক্যফ্রন্টের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সমূহ তুলে ধরেন। এ সময় তিনি খালেদার মুক্তিসহ সাতদফা ঘোষণা করেন।

এদিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগ দিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এখন থেকে একটি মুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি। স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে আজকের এই লড়াই শুরু হলো নতুন আঙ্গিকে। শপথ নিচ্ছি- গণতন্ত্রের অধিকারগুলো আদায় করে ঘরে ফিরব। এসময় তিনি ঐক্যের বাইরে থাকা দলগুলোকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যোগ দেয়ার আহ্বান জানান।

এ সময় আরো বক্তব্য রাখেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রমুখ।

সংবাদ সন্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন জাসদ সভাপতি আ. স. ম. রব, ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মুহাম্মদ মনসুর, গণফোরামের নির্বাহী সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসীন মন্টু, জাতীয় ঔক্য প্রক্রিয়ার আ. ব. মোস্তফা আমীন, জাসদ সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মালেক রতন।

বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের ৭ দফা দাবিগুলো হলো—
১. অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে সরকারের পদত্যাগ, জাতীয় সংসদ বাতিল, আলোচনা করে নিরপেক্ষ সরকার গঠন এবং খালেদা জিয়াসহ সব রাজবন্দীর মুক্তি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার।
২. নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন ও নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার নিশ্চয়তা দেওয়া।
৩. বাক্, ব্যক্তি, সংবাদপত্র, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সব রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
৪. কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন, সামাজিক গণমাধ্যমে মতপ্রকাশের অভিযোগে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার ও গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তি দিতে হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করা।
৫. নির্বাচনের ১০ দিন আগে থেকে নির্বাচনের পর সরকার গঠন পর্যন্ত বিচারিক ক্ষমতাসহ সেনাবাহিনী মোতায়েন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়োজিত ও নিয়ন্ত্রণের পূর্ণ ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া।
৬. নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা নিশ্চিত এবং সম্পূর্ণ নির্বাচনপ্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণে তাঁদের ওপর কোনো ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ না করা এবং গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করা।
৭. তফসিল ঘোষণার তারিখ থেকে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত চলমান সব রাজনৈতিক মামলা স্থগিত রাখা এবং নতুন কোনো মামলা না দেওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া।

১১টি লক্ষ্য হলো—
১. মুক্তিসংগ্রামের চেতনাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক নির্বাহী ক্ষমতা অবসানের জন্য সংসদে, সরকারে, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা এবং প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ, ন্যায়পাল নিয়োগ করা।
২. সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ ও সৎ-যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগের জন্য সাংবিধানিক কমিশন গঠন করা।
৩. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ক্ষমতা নিশ্চিত করা।
৪. দুর্নীতি দমন কমিশনকে যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার নিশ্চিত করা হবে। দুর্নীতিমুক্ত, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তুলে সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে দুর্নীতি কঠোর হাতে দমন ও দুর্নীতির দায়ে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা।
৫. বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরিবেশ সৃষ্টি, বেকারত্বের অবসান ও শিক্ষিত যুবসমাজের সৃজনশীলতা ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধাকে একমাত্র যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা।
৬. জনগণের মৌলিক মানবাধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন, কৃষক-শ্রমিক ও দরিদ্র মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সরকারি অর্থায়নে সুনিশ্চিত করা।
৭. জনপ্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় সরকারসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতি ও দলীয়করণ থেকে মুক্ত করা।
৮. বাংলাদেশ ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা আনা, সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার, সুষম বণ্টন ও জনকল্যাণমুখী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা।
৯. জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জাতীয় ঐকমত্য গঠন এবং প্রতিশোধ, প্রতিহিংসা ও নেতিবাচক রাজনীতির বিপরীতে ইতিবাচক সৃজনশীল এবং কার্যকর ভারসাম্যের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা।
১০. ‘সকল দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’—এই নীতির আলোকে পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা।
১১. প্রতিরক্ষা বাহিনীকে আধুনিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও সমরসম্ভারে সুসজ্জিত, সুসংগঠিত ও যুগোপযোগী করা।

মতামত...