,

রেকর্ড ভাঙলেন, রেকর্ড গড়লেন মাহাথির

ডেস্ক নিউজ::

মালয়েশিয়ার রেকর্ড ভেঙে দিলেন ড. মাহাথির মোহাম্মদ। রচিত হলো এক নতুন ইতিহাস। যে দেশটি তিনি দীর্ঘ সময় নিজ হাতে রচনা করেছিলেন আধুনিক হিসেবে, যে জন্য তাকে বলা হয় আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার, সেই মালয়েশিয়ার ক্ষমতার মসনদে তিনিই বসতে চলেছেন ৯২ বছর বয়সে। পৃথিবীর ইতিহাসে এটা বিরল। শপথ নিয়ে এ পদে এলে তিনিই হবেন বিশ্বের সবচেয়ে বয়সী প্রধানমন্ত্রী। এটা হবে তার একটি নতুন রেকর্ড। অন্য যে রেকর্ডটি তিনি এরই মধ্যে গড়েছেন তা হলো ৬১ বছর পর তিনিই প্রথম ক্ষমতাসীন বারিশান ন্যাশনাল জোটকে পরাজিত করলেন বিরোধী জোটে এসে। এ দুটিই তার জন্য অনন্য রেকর্ড। বুধবার অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট নির্বাচন ছিল মালয়েশিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। তাই সারা বিশ্ব তাকিয়ে ছিল দেশটির দিকে। জরিপ নানা মতামতকে উপেক্ষা করে মাহাথির প্রমাণ করে দিলেন তিনিই পারেন। তিনিই পারেন মালয়েশিয়ার নেতৃত্ব দিতে। ২২২ আসনের পার্লামেন্টে তার নির্বাচনী জোট পাকাতান হারাপান (এলায়েন্স অব হোপ) পেয়েছে ১১৩ আসন। এককভাবে সরকার গঠন করতে হলে এ সংখ্যা যথেষ্ঠ। কারণ, সরকার গঠন করতে হলে একটি দলকে কমপক্ষে ১১২টি আসন পেতে হয়। এর থেকেও একটি আসন বেশি পেয়েছে পাকাতান হারাপান। ফলে মালয়েশিয়া ঝুলন্ত পার্লামেন্টের দিকে যাচ্ছে এমন পূর্বাভাষ মিথ্যা প্রমাণ হয়ে গেলো। অন্যদিকে ভরাডুবি ঘটেছে ক্ষমতাসীন বারিশান ন্যাশনাল (বিএন) দলের। তারা পেয়েছে মাত্র ৭৯ টি আসন। বাদ বাকি আসন পেয়েছে অন্যান্য দল। এখন প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের রাজনৈতিক ভবিষ্যত শেষ হয়ে যেতে পারে। এমনই আভাষ মিলেছে বিভিন্ন মিডিয়ায়। তাকে দলের নেতৃত্ব থেকেও সরিয়ে দেয়া হতে পারে। তাছাড়া তার বিরুদ্ধে ‘১এমডিবি’ রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আছে তারও নতুন করে তদন্ত হতে পারে। বিচার করা হতে পারে। তাতে তিনি অভিযুক্ত হলে পেতে পারেন শাস্তি। তিনি নির্বাচনের ফল মেনে নিয়েছেন। ৪৮ বছর বয়সী একজন ডাক্তার সুভা সেলভান বলেছেন, দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে আমি আশা করি দেশে ভবিষ্যতে ভাল কিছু দেখতে পাবো। আমরা আশা করি ভবিষ্যত সরকার হবে উন্নততর, অবাধ, মুক্ত ও ঐক্যবদ্ধ। ওদিকে বুধবার গভীর রাতে নির্বাচনের ফল প্রকাশ হতে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে রাতের মালয়েশিয়ার রাস্তার দৃশ্য পাল্টে যেতে থাকে। হাজার হাজার উৎসুক মানুষ রাস্তায় নেমে উল্লাস করতে থাকে। ওদিকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে নয়টায় মাহাথির মোহাম্মদ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে পারেন বলে খবর প্রকাশিত হয়। পরে মালয়েশিয়ার মিডিয়াই জানিয়েছে তা আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। এর কারণ কি? কারণ হলো, মাহাথির মোহাম্মদের পাকাতান হারাপান জোটে যেসব দল আছে তাদের কেউই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় নি। তাই কে এখন সরকার গঠন করবে সে সিদ্ধান্ত দেবেন মালয়েশিয়ার রাজা। তিনি সিদ্ধান্ত দেয়ার পরই প্রধানমন্ত্রী শপথ নেবেন। গঠন করবেন সরকার। বিজয় নিশ্চিত বুঝতে পেরে বৃহস্পতিবার দিনের একেবারে শুরুতে সংবাদ সম্মেলন করেন মাহাথির। সেখানে তিনি বলেন, হ্যাঁ এখনো আমি বেঁচে আছি। আমার জোট কোনো প্রতিশোধ নেবে না। তবে আইনের শাসন প্রবর্তন করবে। এ সময় তিনি উল্লাসরত নেতাকর্মী সমর্থকদের বলেন, দু’দিনের সরকারি ছুটি দেয়া হবে। তবে এই ছুটি বিজয়ীদের জন্য নয়।
উল্লেখ্য, মালয়েশিয়ায় সবচেয়ে বেশি দিন ক্ষমতায় থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির। তিনিও বারিশান ন্যাশনাল জোটের প্রধান ছিলেন। তখন ১৯৮১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত একটানা ২২ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। আর এ সময়েই একটি দরিদ্র দেশ মালয়েশিয়াকে বিশ্বের উন্নত দেশের কাতারে নিয়ে গেছেন। অনেকেই তার সমালোচনা করেন। কিন্তু তিনি মালয়েশিয়াকে যা দিয়েছেন তাতে দেশটি এখন বিশ্বজোড়া খ্যাতি পেয়েছে। এখন উন্নয়নশীল অনেক দেশের মানুষ সেখানে কাজ খুঁজেতে পাড়ি জমান। এ জন্য মাহাথিরের নেতৃত্বে থাকা মালয়েশিয়া হয়ে ওঠে এশিয়ান টাইগারদের অন্যতম। ১৯৯০ এর দশকের পর এ অঞ্চলের যেসব দেশের অর্থনীতির দ্রুত বিস্তার ঘটে তাদেরকে এশিয়ান টাইগারস হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তবে কেউ কেউ তাকে কর্তৃত্ববাদী বলে আখ্যায়িত করেন। কারণ, তিনি বিতর্কিত নিরাপত্তামুলক আইন ব্যবহার করে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে জেলে ভরেছেন। সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছেন তার অধীনে থাকা উপ প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ইস্যুতে। প্রথমে তিনি তাকে বরখাস্ত করেন। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও সমকামিতার অভিযোগ আনা হয়। সমকামিতার অভিযোগে তাকে জেলে ভরেন। এটা এমন একটি সময়ে ঘটে যখন আনোয়ার ইব্রাহিম অর্থনীতি ও রাজনীতিতে সংস্কার দাবি করেছিলেন। নাজিব রাজাকের রাজনৈতিক গুরুও মাহাথির মোহাম্মদ। তারই আস্কারায় ২০০৮ সালে প্রধানমন্ত্রী হন নাজিব। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হন তিনি। অভিযোগে বলা হয় তিনি ‘১এমডিবি’ তহবিল থেকে প্রায় ৭০ কোটি ডলার নিজের ব্যক্তিগত ব্যাংক একাউন্টে নিয়েছেন। তবে নাজিব এসব অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন। কিন্তু তদন্তে যাতে তিনি ধরা না পড়েন এ জন্য তদন্ত করতে পারেন এমন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তাদের তিনি সরিয়ে দেন। তখনও বিএন পার্টির সঙ্গে যুক্ত মাহাথির। নাজিবের এই দুর্নীতি দেখে তিনি ঠিক থাকতে পারেন নি। তাই ২০১৬ সালে তিনি ওই দল থেকে বেরিয়ে আসেন। যোগ দেন হাকাতান হারাপানের সঙ্গে। ওই সময় তিনি বলেছিলেন, দুর্নীতিকে তিনি সমর্থন দিতে দেখেছেন তার দলকে। তাই তিনি বিব্রত বিএনের বিষয়ে। এরপর জানুয়ারিতে তিনি ঘোষণা দেন, আবারও রাজনীতির মাঠে নামবেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এ জন্য পুরনো ‘শত্রু’ আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে হাত মেলান। চুক্তি হয় মাহাথির নির্বাচিত হলে দু’বছর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে আইন সংশোধন করে বর্তমান জেলবন্দি আনোয়ার ইব্রাহিমকে বের করে আনবেন। তারপর তার হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন।

মতামত...