,

পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে রোহিঙ্গারা

সরওয়ার আলম শাহীন, উখিয়া থেকে ::

জীবন বাঁচাতে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে উখিয়ার বনাঞ্চলের বিভিন্ন পাহাড়-পর্বতে আশ্রয় নেয়া সাত লাখ রোহিঙ্গার অধিকাংশ পরিবার পাহাড় ধসের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। বর্ষা মৌসুমে অতি বর্ষণ ও পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে পালংখালী ইউনিয়ন ও তৎসংলগ্ন এলাকাগুলো প্রবল বন্যায়  প্রতিবছর ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। বসতবাড়ি নিমজ্জিত ও পাহাড় ধসে প্রতি মৌসুমে এখানে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। উপজেলা প্রশাসন ও বনবিভাগ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসরত লোকজনদের নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার মাইকিং করে আগাম সতর্ক সংকেত জানিয়ে দিলেও বাস্তবে তা কোনো কাজে আসে না। বর্তমানে উখিয়ার আশ্রিত রোহিঙ্গাদের অধিকাংশ পরিবার পাহাড়ের উপর, ঢালুতে ও নিচু এলাকায় যত্রতত্র মাটি কেটে শ্রেণি পরির্বতন করে ঝুপড়ি বেঁধে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। আসন্ন বর্ষা মৌসুমে এসব ন্যাড়া পাহাড় ভারি বর্ষণে ধসে পড়ে ব্যাপক আকারে রোহিঙ্গাদের প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন পরিবেশবাদী সচেতন মহল।

সরজমিন উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী, মধুরছড়া, লম্বাশিয়া, ময়নারঘোনা, তাজনিমারখোলা, শফিউল্লাহকাটা ও জামতলি রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব ক্যাম্প এলাকার অধিকাংশ বনভূমি উচু নিচু পাহাড় কেটে মাটির শ্রেণি পরিবর্তন করে রোহিঙ্গারা কোনো রকম থাকার মতো পরিবেশ গড়ে তুলেছে। তবে বর্ষাকালে তাদের অবস্থা কী হবে এ নিয়ে রোহিঙ্গারা একবারো পেছন দিকে ফিরে তাকায় নি। স্থানীয় চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী জানান, প্রতি বর্ষাকালে পালংখালী ইউনিয়নের অধিকাংশ জলমগ্ন হয়ে বন্যা দেখা দেয়। পাহাড়ী ঢলের পানিতে বসতবাড়ি তলিয়ে যায়। প্রাণহানি ও নিখোঁজের মতো ঘটনাও ঘটে। তিনি বলেন, এমতাবস্থায় রোহিঙ্গারা যে পাহাড় কেটে ঝুপড়ি বেঁধে বসবাস করছে তাদের অবস্থা বর্ষাকালে কী হবে তা নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের আগে-ভাগেই ভেবে দেখা উচিত।
কুতুপালং পিপি জোনের মাঝি খালেদ হোসেন জানান, মিয়ানমার থেকে সর্বস্বান্ত হয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের দুই/তৃতীয়াংশ পরিবার পাহাড়ের উচু-নিচু ঢালু ও থলিতে ঝুপড়ি বেঁধে বসবাস করছে। এরা বর্ষা মৌসুমে কোনো চিন্তা-ভাবনা করার সুযোগ পায়নি, যেহেতু যেভাবে রোহিঙ্গা আসার ঢল নেমেছে সে অবস্থায় যে সেখানে পারে সেখানে আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে। তিনি বলেন, আগামী বর্ষা মৌসুমের আগে অধিকাংশ রোহিঙ্গা সরিয়ে নিরাপদ স্থানে না নিলে পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘুরে পাহাড়ের উপরে ঝুপড়ি বেঁধে বসবাস করছে রাজুমা বেগম (২০)। পাঁচ মাস আগে তার স্বামী নুরুল কবিরকে মিয়ানমারের সেনারা মেরে ফেলায় ছয় মাসের গর্ভাবস্থায় এক শিশুকে নিয়ে সে তার পিতা সাইফুল হকের ঝুপড়ির পার্শ্বে খাদের কিনারায় আরো একটি ঝুপড়ি বেঁধে আশ্রয় নিয়েছে। বর্ষাকালে এ পাহাড় ধসে পড়লে শিশু পুত্রদের নিয়ে কী করবে জানতে চাওয়া হলে রাজুমা বেগম জানায়, তার করার কিছু নাই। স্বামীহারা অবস্থায় এখানে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ছেড়ে কোথাও যাওয়ার মতো তার আর সহায় সম্বল নেই। এভাবে অসংখ্য রোহিঙ্গা পরিবার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছে।
এ ব্যাপারে কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সাইফুল আশরাফ জানান, রোহিঙ্গাদের অধিকাংশই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। বর্ষাকালে পাহাড় ধসে এসব রোহিঙ্গাদের প্রাণনাশের আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আশ্রিত পরিবারদের একটি পরিত্যক্ত সমতল স্থানে নিয়ে যাওয়া হলে সরকারের বনভূমি রক্ষার পাশাপাশি রোহিঙ্গারাও পাহাড় ধসের ঝুঁকি থেকে রক্ষা পাবে।
কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি সাংবাদিক দীপক শর্মা দিপু পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে রোহিঙ্গাদের প্রাণহানির আশঙ্কা করে বলেন, উখিয়ায় আশ্রিত সাত লাখ রোহিঙ্গার অধিকাংশ পরিবার পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে। আবার বর্ষায় বৃষ্টির পানিতে এসব রোহিঙ্গাদের মল-মুত্র, বর্জ্যসহ নানান ধরনের ময়লা-আবর্জনা লোকালয়ে চলে এসে স্থানীয়রাও বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই এসব রোহিঙ্গাদের অন্যত্র সরিয়ে নেয়া অতীব প্রয়োজন বলে তিনি মনে করছেন।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান বলেন, ইতিমধ্যে তিনি রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘুরে রোহিঙ্গাদের আবাসন প্রত্যক্ষ করেছেন। বর্ষাকালে রোহিঙ্গারা যাতে ক্ষতির মুখে না পড়ে সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে আপাতত ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের কোথাও সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা সরকারের নেই।

সূত্র : মানবজমিন।

মতামত...