,

প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনবাসীর ভোগান্তি, কান্না!

আমান উল্লাহ আমান, সেন্টমার্টিন থেকে ফিরে॥         20160122_165932
দেশের সর্বদক্ষিনে স্থলভাগ থেকে বিচ্ছিন্ন এবং সর্বশেষ ভূ-খন্ড প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। পর্যটন মৌসুমে প্রতিদিন দেশ বিদেশের হাজার হাজার পর্যটক ভ্রমনে আসে। তাছাড়া দ্বীপে বসবাস করছে আট হাজারেরও লোক। পর্যটকদের জন্য সেন্টমার্টিন দ্বীপটি একটি জনপ্রিয় ও আকর্ষনীয় পর্যটন কেন্দ্র। প্রতিদিন ৫/৬ টি পর্যটকবাহী জাহাজে করে হাজার হাজার দেশ-বিদেশের পর্যটক ভ্রমনে যায়। দেশ-বিদেশের বিখ্যাত এমন একটি দর্শনীয় দ্বীপের মানুষগুলো কেমন আছে। স্থলভাগ থেকে বিচ্ছিন্ন ভূ-খন্ড প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনবাসী ও পর্যটকদের জন্য নিত্য দিনের মৌলিক চাহিদাগুলো কিভাবে পূরন হচ্ছে। পূরণ হলেও তা কিভাবে ওই দ্বীপে পৌঁছে যাচ্ছে। এখানে কি কি প্রতিবন্ধকতা রয়েছে এমন খবর কি কেউ কখনো নিয়েছে। মানুষের মৌলিক চাহিদার নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যগুলো দ্বীপে নিয়ে যেতে পথে পথে যে ভোগান্তি ও প্রতিবন্ধকতা, যোগাযোগ এবং বসবাসে যে অসুবিধা রয়েছে তা নিয়ে ‘সেন্টমার্টিনের সমস্যা ও করণীয়’ বিষয়ে মতবিনিময় সভা করেছে।
উক্ত সভায় দ্বীপবাসীর কান্না, আহাজারি, ক্ষোভ প্রলক্ষিত হয়েছে। ওই সভায় দ্বীপবাসী প্রশ্ন তুলেছেন সেন্টমার্টিন কি বাংলাদেশের ভূ-খন্ড নই? নাকি এটি বিচ্ছিন্ন কোন দেশের অঙ্গরাজ্য?
কক্সবাজার জেলার অনলাইন পোর্টালগুলোর সম্পাদক ও সাংবাদিকরা গত ২১ জানুয়ারি প্রবালদ্বীপে ভ্রমনে গেলে সেন্টমার্টিন নিউজ বিডি ডটকম’র আয়োজনে এবং সেন্টমার্টিন স্টুডেন্ট ফোরামের সহযোগীতায় স্থানীয়দের সাথে এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। স্টুডেন্ট ফোরামে সহ সভাপতি আয়াতুল্লাহ পরিচালনায় এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ অনলাইন নিউজ পোর্টাল এসোসিয়েশন (বনপা)’র সাধারণ সম্পাদক ও কক্সবাজার অনলাইন প্রেস ক্লাবের সভাপতি অধ্যাপক আকতার চৌধুুরী এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন বনপা’র সিনিয়র যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক রুকনুজ্জামান রনি। বক্তব্য রাখেন সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি মুজিবুর রহমান, সাবেক চেয়ারম্যান মাওঃ ফিরোজ, বিএনপির সাধারন সম্পাদক নুরুল আলম, স্কুল কমিটির সভাপতি নুর আহমদ সহ জেলার বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালের মালিক, সাংবাদিক ও কলাকুশলীরা অংশ নিয়েছেন।সাংবাদিকদের বিরাট বহর সেন্টমার্টিনদ্বীপের স্থানীয়দের মাঝে সাড়া ফেলেছে। এ সুযোগে অনেকই দ্বীপের বিভিন্ন সমস্যা ও তাদের জীবন জীবিকার বিষয় সংবাদকর্মীদের কাছে তুলে ধরেন।
এসময় দ্বীপবাসীরা অভিযোগ করে বলেন, মানুষের মৌলিক চাহিদার প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য গুলো টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিনে নিতে বিজিবি কর্তৃক বিভিন্নভাবে হয়রানী, হাসিল বা ইজারার নাম দিয়ে ঘাটে বেপরোয়া চাঁদাবাজি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক সঙ্কট, স্থানীয়দের আবাসন তৈরীতে প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা সমস্যা ছাড়াও প্রবালদ্বীপে সরকারী হাসপাতাল থাকলেও চিকিৎসক না থাকায় দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেন সাংবাদিকদের নিকট।20160123_065433
দ্বীপবাসীরা আরো বলেন, টেকনাফ থেকে চাল, তৈল, ডাল, তরকারি, আবাসনের জন্য ইট, সিমেন্ট, বালি ইত্যাদি নিতে টেকনাফ ঘাটে হাসিল বা ইজারার নামে চাঁদা আদায় করছে। তারা বলেন, নিত্য প্রয়োজনীয় চাল, ডালে দেশের অভ্যন্তরে সরবরাহ করতে টেকনাফের ঘাট থেকে ইজারা বা হাসিলের নাম দিয়ে টাকা আদায় করা হয়। আর ঐ টাকা না দিলে কোন মালামাল ট্রলারে বহন করে দ্বীপে নেওয়া যায়না। এরপর হাসিলের টাকা আদায় করেও রেহাই নেই দ্বীপবাসীর। প্রশাসন কর্তৃক অনুমতির কাগজপত্র রয়েছে কিনা তা দেখতে বিজিবি কর্তৃক মালামাল তল্লাশীর নামে হয়রানী ও ভোগান্তিতে পড়ে। এসব কিছুর পর ট্রলার যোগে সেন্টমার্টিনে পৌঁছলেও দ্বিতীয় দফা ইজারা বা হাসিল প্রদান করতে হয়। যেমন টেকনাফের ঘাটে একটি চালের বস্তা প্রতি ১৫ টাকা করে এবং সেন্টমার্টিন ঘাটেও ১৫ টাকা করে দিতে হয়, কাঁচা তরকারির প্রতি বস্তা ২০০ থেকে ৩০০ টাকা, ঔষধের কার্টুনে বিজিবি’র কতিপয় জওয়ানদের প্রদান করতে হয় ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা, একটি ট্রলার থেকে ৬০০ টাকা থেকে ১০০০ টাকা। আবাসন সামগ্রী ইট, বালি ও সিমেন্ট নিয়ে গেলে প্রতিবস্তায় কোস্টগার্ডের কতিপয় সদস্যদের ৫০ টাকা করে প্রদান করতে হয়। ফলে সব কিছু পণ্যের দাম বেড়ে যায় দ্বিগুন। এতে দ্বীপবাসী প্রশ্ন তুলেন, আমরা কি ভিন্ন কোন দেশে বসেন্টমার্টিনসবাস করছি। কেন একটি খাদ্য পণ্যে দুইবার ইজারা নেয়া হয়। কেন বিজিবি কর্তৃক তল্লাশীর নামে হয়রানী করা হয়। মিয়ানমারের সাথে আমাদের কোন ঘাটও নেই। ফলে ওই দেশে পাচারে কোন প্রশ্নই আসতে পারেনা। তাছাড়া বঙ্গোপসাগের সর্বদা নৌ-বাহিনী ও কোস্টগার্ড নিয়োজিত রয়েছে। দ্বীপবাসীররা প্রশ্ন রাখেন, কেন এই হয়রানি ও অবিচার? আমরা কি স্বাধীন দেশের ভূখন্ডের জনগণ নই? মতবিনিময় সভায় বক্তারা আরো বলেন, ৮ হাজার জনগনের জন্য দ্বীপে একটি মাত্র প্রাইমারি বিদ্যালয় রয়েছে। ৫০০ শিক্ষার্থীর জন্য আছে মাত্র দুইজন সরকারী শিক্ষক। ফলে বিপর্যস্থ ও পিছিয়ে পড়েছে দ্বীপের শিক্ষা ব্যবস্থা। তবুও শতপ্রতিকূলতা স্বত্ত্বেও গত তিন বছরে শতভাগ পাশ করেছে দ্বীপের প্রাথমিক শিক্ষার্থীরা।
এছাড়া চিকিৎসা সেবা সম্পূর্ণ বঞ্চিত হচ্ছে দ্বীপবাসী। একটিমাত্র হাসপাতাল থাকলেও নেই কোন চিকিৎসক। ইতিমধ্যে চিকিৎসার অভাগে মৃত্যু বরণ করতে হয়েছে এক প্রসূতি মহিলার ও এক শিশুর। গত ১৭ জানুয়ারি দিলদার বেগম (৩৪) নামে এক প্রসূতি মহিলার প্রসব বেদনা শুরু হয়। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে প্রসব না হওয়ায় বাধ্য হয়ে পরের দিন সকালে ট্রলারে করে টেকনাফে নিয়ে আসতে হয়েছে। সেখান থেকে কক্সবাজার নেয়ার পথে পথিমধ্যে মৃত্যুবরণ করে। অপরদিকে গত ১৮ জানুয়ারি ডায়রিয়ায় তানভীর নামে এক শিশুর অকাল মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসা না থাকায় চিকিৎসার অভাবে অকাল মৃত্যু হয়েছে বলে সভায় দাবী করা হয়। এসময় দ্বীপবাসীরা প্রশ্ন তুলেন, সরকারি চিকিৎসক দ্বীপে পাঠালেও কেন অবস্থান করেনা। তারা কি সরকারের বেতনভূক্ত নই। st-1
তারা আরো বলেন, আবাসন তৈরী করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাধা আসে। পরিবেশের কথা বলে কোন ঘর-বাড়ী নির্মাণ করতে দেয়া হয় না। তবে কিভাবে দ্বীপে দ্বী-তল ও তৃতীয় তলা বিশিষ্ট হোটেল-মোটেল তৈরী করা হয়েছে। তখন পরিবেশবাদীরা কোথায় থাকেন। এতে দ্বীপবাসীর সাথে বৈষম্য করা হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন।
সেন্টমার্টিনের জনগণ বিভিন্ন হয়রানি ও ইজারার নাম দিয়ে চাঁদা আদায় থেকে রেহাই পেতে এবং দেশের নাগরিক অধিকার শতভাগ ফিরিয়ে দেয়ার জন্য  সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি সাংবাদিকদের মাধ্যমে আহবান জানান।
এব্যাপারে সেন্টমার্টিনস্থ কোস্টগার্ডের স্টেশন কমান্ডার ডিকশন চৌধুরী বলেন, কোস্টগার্ডের নামে আনিত অভিযোগ সত্য নই। এবিষয়ে কোন অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবু খতিয়ে দেখা হবে।
২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেঃ কর্ণেল মোঃ আবুজার আল জাহিদ জানান, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। এমন অভিযোগ পেলে খতিয়ে দেখা হবে। বিজিবি সীমান্ত রক্ষায় অতন্দ্র প্রহরী এবং সুশৃংখল বাহিনী। সূনির্দিষ্ট প্রমান পেলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ শফিউল আলম বলেন, তিনি এধরনের অভিযোগ শুনেননি। কারা এই ইজারা নিচ্ছে তা সূনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবেন বলে জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*