,

প্রভাবশালীরা নিয়ন্ত্রন করছে ইয়াবা ব্যবসা

শহিদুল ইসলাম, উখিয়া []ইয়াবা
কক্সবাজারের উখিয়া ইয়াবার স্বর্গরাজ্য পরিনত হয়ে উঠেছে। গডফাদারেরা আইনের ফাঁক ফোকর দিয়ে ধরা পড়ে জেল থেকে বেরিয়ে এসে দেশি-বিদেশি হরেক ব্র্যান্ডের তরল ও শুকনো মাদক, হেরোইন, গাঁজা, ইয়াবা ট্যাবলেট ব্যবসা চালিয়ে গেলে ও ধরা ছোয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। যার ফলে উঠতি বয়সী তরুণ ও স্কুল কলেজ গামী ছাত্ররা মাদকসক্ত হ মানব পাচার, দিন দিন দিন মূল্যবোধের অবক্ষয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন চলতি বছরে শত কোটি টাকার মাদক দ্রব্য উদ্ধার করলেও মিয়ানমার থেকে কোটি কোটি টাকার ইয়াবা পাচার অব্যাহত থাকায় কোন মতেই ইয়াবা ব্যবসা থামানো যাচ্ছেনা। এসব ইয়াবাসহ মাদক নিয়ন্ত্রণ করছে এক শ্রেণীর প্রভাবশালী মহল।
সংঘবদ্ধ মাদক পাচারকারীরা আগে তাদের ভাড়াটে লোক দিয়ে মাদক পাচার ও বাজার জাত করে থাকলেও সাম্প্রতিক বছর গুলোতে তারা এসব মাদক পাচার ও বাজারজাতে বিভিন্ন ধরনের কৌশলের অবলম্বন হিসেবে মহিলা, স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে এগোচ্ছে। এতে একদিকে মাদক পাচার ও বাজারজাত করা যেমন সহজ ও নিরাপদ, অন্যদিকে নগদ কালো টাকার লোভে পড়ে সাধারণ স্বপ্নে বিভোর শিক্ষার্থী, নিম্ম, মধ্য ও উচ্চ বিত্ত পরিবারের লোকজন, বিভিন্ন পেশাজীবী, সরকারি, বেসরকারি, এনজিও কর্মী, চাকরিজীবী, বেকার কিশোর-যুবকরা পাচারে জড়িত হয়ে পড়ছে। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বিকলাঙ্গ ও অন্ধকারাচ্ছন্নতার পাশাপাশি প্রতি বছর মাদকের পেছনে হাজার হাজার কোটি টাকা অবৈধ পথে পাচার হয়ে যাচ্ছে। পক্ষান্তরে দেশের জন্য সরকারের দেওয়া ভুর্তকি মূল্যের সার, ডিজেল, কেরোসিন, ভোজ্যতেল, জীবন রক্ষাকারী বিভিন্ন প্রকারের ঔষধ, নানা ভোগ্যপণ্য চোরাইপথে মিয়ানমার পাচার হয়ে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি সদস্যদের ভূমিকা ও তৎপরতা কিছুটা প্রশংসনীয় ও উল্লেখযোগ্য হলেও এসব এলাকায় সরকারের নিয়োজিত অন্যান্য বিভিন্ন বাহিনী ও সংস্থার লোকজনের তৎপরতা ও ভূমিকা তেমন আশানুরূপ নয় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এতে মাদক প্রতিরোধের স্থলে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার এক শ্রেণির লোকজন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাচারকারীদের সহযোগিতা দিয়ে বা নিজেরা জড়িয়ে পড়ে লাভবান হচ্ছে বলেও একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
এ উপজেলার পালংখালী আঞ্জুমানপাড়া, থাইংখালী রহমতেরবিল, ধামনখালী, বালুখালী কাটা পাহাড়, হাতি মুড়া, ডেইলপাড়া, পূর্ব ডিগলিয়া, কড়ইবনিয়া, চাকবৈঠা, নাইক্ষ্যংছড়ি, ঘুনধুম, জলপাইতলি, তুমব্রু কোনারপাড়া, মগপাড়া, রেজু, আমতলী, ওয়ালিদং ও আচারতলীসহ প্রায় ৪২টি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে ইয়াবাসহ বিভিন্ন প্রকারের মাদক দ্রব্য পাচার হয়ে এদেশে আসছে। সীমান্তের এসব পয়েন্টের ওপাড়ে মিয়ানমারের বিভিন্ন এলাকায় ৩৭টির মত ইয়াবা তৈরির ছোট বড় কারখানা রয়েছে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের ২ শতাধিক মাদক পাচারকারী ও চোরাকারবারীরা যৌথ সিন্ডিকেট করে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ পিস ইয়াবা ও অন্যান্য মাদক দ্রব্য পাচার করে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। এসব মাদক  চোরাকারবারীর সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে জড়িতরা হলেন, উখিয়ার হিজলীয়া এলাকার উত্তর পুকুরিয়া তেলী পাড়া গ্রামের মৃত মোঃ ইসলামের পুত্র শীর্ষ ইয়াবা গডফাদার মোঃ বাবুল প্রকাশ ইয়াবা বাবুল এক সময়ের খাবার হোটলের সাধারণ কর্মচারী থেকে রাতারাতি কালো টাকার পাহাড়, নিজ এলাকায় আলীশান বাড়ী, দোকানপাট সহ কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের উপর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদকের) কোন প্রকার খবর নেই বলে জানা গেছে। তার ঘনিষ্ট সহযোগী মনসুর আলীর পুত্র মোকতার আহম্মদ প্রকাশ ইয়াবা মোক্তার সে থানা পুলিশের সোর্স পরিচয় ও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে এলাকার নীরহ লোকজনকে মিথ্যা মামলার ভয়ভীতি প্রদর্শন করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে একাধিক অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে, একই এলাকার ব্যালেক জলুর পুত্র নুরুল আলম প্রকাশ ইয়াবা নুরাইল্যা, উখিয়ার ঘিলাতলী এলাকার ইয়াবা আয়াছ, পূর্ব ডেইলপাড়া কড়ইবনিয়া এলাকার ওয়ার্ড যুবদল নেতা শাহজান খলিফা প্রকাশ ইয়াবা শাহাজান, একই এলাকার মুন্সি আলম মেম্বারের ছোট ভাই রফিক আলম প্রকাশ ইয়াবা রফিক, থাইংখালী গজুঘোনা এলাকার নুর মোহম্মদের পুত্র জসিম উদ্দিন প্রকাশ ইয়াবা জসিম, থাইংখালী ঘোনার পাড়া এলাকার আলী আহম্মদের পুত্র চিহ্নিত ইয়াবা ব্যবসায় নুরুল আজিম প্রকাশ ইয়াবা আজিম, বালুখালী পানবাজার এলাকার হাজী আব্দুল মজিদের পুত্র বকতার আহম্মদ প্রকাশ ইয়াবা বকতার, তার ছোট ভাই ইয়াবা জাহাঙ্গীর, একই এলাকার আব্দুল বারির ছেলে এনামুল হক ছেলে এনামুল হক কোটি কোটি টাকা ও বিলাসবহুল গাড়ীবাড়ীর মালিক হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে উখিয়া থানায় একাধিক মাদক দ্রব্য পাচার অভিযোগ মামলাও রয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
সীমান্ত নিরাপত্তায় নিয়োজিত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবির) পক্ষ থেকে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী (বিজিপি) সদস্যদের নিকট বিগত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন সভায় সীমান্তের মাদক পাচার ও মিয়ানমার সীমান্তের অভ্যন্তরে স্থাপিত ৩৭টি ইয়াবা তৈরির কারখানা বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছে। প্রতিটি সভায় মিয়ানমারের পক্ষ থেকে মাদক পাচার প্রতিরোধে ও ইয়াবা তৈরির কারখানা বন্ধের ব্যাপারে বিজিবিকে আশ্বস্ত করা হলেও কার্যত এ ব্যাপারে মিয়ানমার সরকার তেমন কোন কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে কক্সবাজারস্থ বিজিবির সেক্টর কমান্ডার এম আনিসুর রহমান জানিয়েছেন।
গেল বছর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কতৃক সারাদেশে ৭৬৮ জন ইয়াবা পাচারকারীর তালিকা প্রকাশ করা হয়। এতে তালিকাভুক্ত উখিয়া, নাইক্ষ্যংছড়ি ও টেকনাফের অধিকাংশ পাচারকারীর নাম রয়েছে। এছাড়াও স্থানীয়ভাবে প্রতিটি থানা ও বিজিবিসহ বিভিন্ন সরকারীর সংস্থার নিকট আলাদা তালিকা রয়েছে। সেই তালিকাকে অনুসরণ করে অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে জানা গেছে। উখিয়ার সীমান্তবর্তী পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী জানান, তার ইউনিয়নে ঘরে ঘরে ইয়াবা ব্যবসায়ী হওয়ায় যুব ও ছাত্র সমাজ ধ্বংসের দিকে চলে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ইউনিয়নের সিংহভাগ যুব সমাজ ইয়াবা আসক্ত হয়ে পাগল হয়ে যাবে। তাই তিনি ইয়াবা ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার জন্য প্রশাসনের নিকট জোর দাবী জানিয়েছেন।
উখিয়া থানার ওসি মোঃ হাবিবুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, উখিয়ায় প্রায় শতাধিক চিহ্নিত  ইয়াবা পাচারকারী ও সেবনকারীর রয়েছে, তাদেরকে কোন প্রকার ছাড় দেওয়া হবেনা এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রনালয়ও ইতিমধ্যে উক্ত  ইয়াবা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে জিরো ট্রলারেন্স ঘোষনা করেছেন বলে জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে সু-নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে বদ্ধ পরিকর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*