,

উখিয়া-টেকনাফে ৬৬৪ দালাল ধরাছোঁয়ার বাইরে : থাইল্যান্ডের গণকবরে ১০বাংলাদেশী, ৫০০ অধিবাসীকে হত্যার অভিযোগ

শফিক আজাদ, উখিয়া থেকে []          Tailand-2
থাইল্যান্ডের গণকবরে ২৬টি মরদেহের মধ্যে ১০জন বাংলাদেশীর লাশ এবং ১জনকে জীবিত উদ্ধারের খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে উখিয়া-টেকনাফে দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পথে নিখোঁজ হওয়া স্বজনদের মাঝে নেমে এসেছে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা। উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশী যুবকের অভিযোগ মুক্তিপন না পেয়ে থাই জঙ্গলে প্রায় ৫ শতাধিক অধিবাসীকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। অপরদিকে উখিয়া-টেকনাফে রোহিঙ্গা শরনার্থী শিবির ভিত্তিক দালালচক্র সহ এ দু-উপজেলার ৬৬৪জন চিহ্নিত ছোট-খাটো দালাল এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে মানবপাচার করে যাচ্ছে। তবে পুলিশ বলছে মানবপাচারকারী দালালকে গ্রেফতারে সর্বাতœক চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সুত্রে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন উপকূল দিয়ে সমুদ্রপথে জীবনের ঝুকি নিয়ে স্বপ্নের হরিণ ধরার আশায় দালালের হাত ধরে অল্প টাকায় মালয়েশিয়া পৌছার লক্ষ্যে পাঁড়ি জমার হাজার হাজার মানুষ। tailand-7মানবপাচারের উপর কর্মরত বেসরকারী এনজিও সংস্থা ইয়ং পাওয়ার ইন সোসিয়াল একশন (ইফসা)’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০১১সাল থেকে  গত ৪বছরে প্রায় ৫০ হাজারের অধিক লোকজন উপকূলীয় এলাকা দিয়ে সাগরপথে পাচার হয়েছে। এদের মধ্যে কিছু সংখ্যক লোক নিদিষ্ট গন্তব্য স্থানে পৌছতে সক্ষম হলেও বেশির ভাগ লোক তাদের গন্তব্যস্থানে পৌছতে  পারেনি। হয়তো সাগরের মাঝপথে নয়তো কোন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার হাতে আটক হয়ে থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও ভারতের কারাগারে জীবন-যাপন করছে বলে তাদের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এরপরও থেমে নেই মানবপাচার গত ৩ মে বাঁশখালী থেকে ১২ মালয়েশিয়াগামীকে উদ্ধার করেছে। এছাড়া নয়াপাড়া ও কুতুপালং শরনার্থী শিবির থেকে গত ১সপ্তাহে আরো অর্ধশতাধিক রোহিঙ্গা উপকূল দিয়ে মালয়েশিয়া পাঁড়ি জমিয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহলের অভিমত এভাবে মানবপাচার অব্যাহত থাকলেও বড় ধরনের ঝুকিরমুখে পড়তে পারে বাংলাদেশ। যেহেতু এদেশের যুব সমাজ পাচারকারীর খপ্পরে পড়ে আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার পাশাপাশি সলীল সমাধি হচ্ছে অকালে। যারই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে বিশ্ব মিডিয়া তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলের সংখলা প্রদেশের গভীর জঙ্গলে আবিস্কৃত গণকবরে ২৬টি মরদেহের মধ্যে ১০টি মরদেহের বাংলাদেশে শরনার্থী বলে সেদেশের সংবাদ সংস্থা নিশ্চিত করেছে। ওইসব গণকবর থেকে একজন বাংলাদেশীকে জীবিত উদ্ধার করেছে থাই পুলিশ। বর্তমানে তিনি থাইল্যান্ডের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। তার নাম আনুজার, গ্রামের বাড়ী নরসিংদীতে বলে জানা গেছে। সে আরো জানিয়েছে তার সাথে আরো ১০জন ছিল এরা সাবাই মারা গেছে বলেও তার অভিমত। ওই জঙ্গলে বিভিন্ন দেশের প্রায় ৫শতাধিক আধিবাসিকে হত্যা খবর তিনি শুনেছে। এছাড়া ও আরেটি গণকবর থেকে ৫০টি মরাদেহের কঙ্গাল উদ্ধার করেছে থাই পুলিশ। ওই জঙ্গলে আরো ১০০টি শরনার্থী বন্ধি শিবির ও ৩২টি গণকবরের সন্ধান পেয়েছে তারা। এ সংক্রান্ত সংবাদ গণমাধ্যমে উঠে আসলে নয়াপাড়া, কুতুপালং শরনার্থী শিবির সহ উখিয়া-টেকনাফ এলাকা থেকে ইতিপুর্বে মালয়েশিয়া যাত্রা কালে মাঝপথে নিঁেখাজ হওয়া হতভাগ্য পরিবার-পরিজনের মাঝে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা।
গতকাল ৫মে মঙ্গলবার সরজমিন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, উখিয়ার করইবনিয়া এলাকার জালাল আহমদের ছেলে রশিদ আহমদ (৩০) ২০১৪সালের জানুয়ারী মাসে জালিয়াপালং ইউনিয়নের দালাল ফয়েজুল্লাহ মাধ্যমে ইনানী উপকূল দিয়ে মালয়েশিয়া যাত্রা করলেও এখনো পর্যন্ত সন্ধান নেই তার। পুর্বডিগলিয়া গ্রামের ছৈয়দ নুরের ছেলে খোরশেদ আলম(২৫) শামসুল আলমের ছেলে শফি (৩০) প্রকাশ বুইষ্যা গত ১বছর পুর্বে মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য সমুদ্রপথে পাঁড়ি দিলেও এখনো পর্যন্ত তাদের কোন সন্ধান পাচ্ছেনা পরিবার। এসব পরিবারের লোকজনের অভিযোগ মুক্তিপণ না পাওয়ায় তাকে থাইল্যান্ডের জঙ্গলে হত্যা করেছে দালালেরা। কৃতুপালং শরনার্থী ক্যাম্প থেকে ২০১২সালের ১৯ জুলাই রেজিষ্ট্রার্ড ক্যাম্পের চিহ্নিত দালাল খাইরুল আমিনের নেতৃত্বে রেজিঃ রোহিঙ্গা বি-ব্লকের মোহাম্মদ শাকের (৩৪) একই ব্লকের রোহিঙ্গা নুরুল আমিন (৩২) হাফেজ আনোয়ার (৪০) প্রকাশ পেঠাইন্যা সহ শতাধিক লোক মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ী থেকে বের হলেও উল্লেখিত ৩জন সহ প্রায় অর্ধশতাধিক লোকএখনো নিখোঁজ রয়েছে। ওই দালাল আজকাল নিখোঁজদের সন্ধান দেবে বলে তাদেরকে কালক্ষেপন করছে। ভুক্তভোগী নুরুচ্ছপা নামে এক রোহিঙ্গা মহিলা সাংবাদিকদের বলেন, তার স্বামী ছৈয়দ আলম প্রায় ১বছর পুর্বে মালয়েশিয়া যাওয়ার কথা বলে বাড়ী চলে গেলেও এখনো পর্যন্ত খোঁজ নেই। তিনি বর্তমান এক সন্তান নিয়ে মানববেতর দিন যাপন করছে বলে প্রতিবেদককে জানান। সম্প্রতি মালয়েশিয়া ফেরত আরেক ভুক্তভোগী কিশোর উখিয়া পূর্ব মরিচ্যা গ্রামের হতদরিদ্র ছৈয়দ আলম চৌকিদারের ছেলে দিদারুল আলম (১৬) প্রকাশ রাব্বী জানান, একই গ্রামে মানবপাচারকারী শাহাব মিয়ার ছেলে দালাল জয়নাল প্রথমে তার শ্বশুড় বাড়ীর টেকনাফ উপজেলার শাহপরীর দ্বীপে নিয়ে যায় তাকে সেখানে আগে থেকে অপেক্ষা করা ৪/৫ জনের একটি দালাল চক্র তাদেরকে পার্শ্ববর্তী একটি বন্দীশালায় নিয়ে যায়। সেখানে ৩দিন অবস্থান করার পর রাব্বীর টাকা পরিশোধ হলেও তার সাথে থাকা অন্যান্যদের লেনদেন সম্পন্ন না হওয়ায় দালাল চক্র সে সহ ১২জনকে মালেশিয়ায় পুলিশের হাতে তুলে দেয়। রাব্বী জানান, মালেশিয়ার চেরামবাগ রিংগিং ইমিগ্রেশন ক্যাম্পে ২ মাস ৪ দিন জেল কাটার পর বাড়ীর সহায় সম্বল বিক্রি করে ৩৫ হাজার টাকা বিমান ভাড়া পৌঁছানোর পর সে দেশে ফিরে আসতে সক্ষম হয়। সে আরো জানায়, মালেশিয়ার কারাগারে তারমত আরো প্রায় সহ¯্রাধিক’ বাংলাদেশী এখনো অনিশ্চিত জীবন যাপন করছে। একই ভাবে থাইল্যান্ড কারাগার থেকে ফেরত আসা কুতুপালং শরনার্থী ক্যাম্পের ছৈয়দুল আমিন (২৪) নামে এক যুবক অভিযোগ করে জানান, সে ৬মাস পুর্বে ক্যাম্পের ছৈয়দ আহামদ নামে এক দালালের মাধ্যমে সাগর পথে মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য থাইল্যান্ড সীমান্তে পৌছলে সেদেশের কোষ্টগার্ড তাকে সহ ওই বোটের প্রায় ২শতাধিক যাত্রীকে আটক করে জেলে নিয়ে যায়। সেখান থেকে সে অনেক কিছুর বিনিময়ে মুক্ত হয়ে চলে আসে। তাকে যে জেলখানা রাখা হয়েছিল সেখানে সহ¯্রাধিক বাংলাদেশী থাকতে পারে বলে সে জানান।
উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ জহিরুল ইসলাম খাঁন বলেন, উর্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে মানবপাচার প্রতিরোধে পুলিশ তৎপর রয়েছে। শতাধিক দালালকে আসামী করে অন্তত ৩৫টি মামলা হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে অর্ধশত মানবপাচারকারীকে।
টেকনাফ থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ আতাউর রহমান খন্দকার বলেন, থানায় বিজিবি,কোষ্টগাড  ও পুলিশের পক্ষ থেকে দেওয়া মানবপাচারকারীর বিরুদ্ধে প্রায় শতাধিক মামলা রুজু করা হয়েছে। এতে ৫৮০ জন দালালের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে তিনি ২শতাধিক পাচারকারীকে আটক করা হয়েছে বলে দাবী করে তিনি বলেন, এখন থেকে যেসব মালয়েশিয়াগামী যাত্রীদের আটক করা হবে তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা রুজু করে জেল হাজতে প্রেরণ করা হবে। পুলিশ সুত্রে জানা গেছে, রোহিঙ্গা ও উখিয়া-টেকনাফ এলাকার ৬৬৪জন দালালকে চিহ্নিত করে একটি তালিকা তারা উর্ধ্বতন কতৃপক্ষের নিকট প্রেরণ করেছে। যারা আত্মগোপন অবস্থায় এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*