,

লামায় বিশুদ্ধ পানির চরম সংকট

মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, লামা []bandarban photo-02, date-04.05
পার্বত্য বান্দরবান জেলার লামায় গ্রীস্মের এ তাপদাহে বিশুদ্ধ পানির চরম সংকট দেখা দিয়েছে। ঝিরি-ঝর্ণায় পানির উৎস নষ্ট হওয়ার কারনে প্রত্যান্ত এলাকাসহ পৌরসভা এলাকায় পানি সংকট দেখা দিয়েছে। নলকূপ, টিউবয়েল, ড্রিপ টিউবয়েল, নদী, খাল ও ঝিরি শুকিয়ে যাওয়াই স্থানীয় লোকজন ঝিরি-ঝর্ণা, পুকুর, নদী-ছড়ার দুষিত পানি ব্যবহার করছেন। এতে ডায়রিয়া, আমাশয়, জন্ডিস ও টাইফয়েট সহ নানা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

জানাগেছে, প্রতিবছর গ্রীষ্মের শুরুতেই বান্দরবানের আদিবাসী ও বাঙ্গালী পাড়াগুলোতে তীব্র খাবার পানির সংকট দেখা যায়। এ বছরও গ্রীস্মের শুরুতে এ সংকট শুরু হয়েছে। এছাড়া জেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকার ঝিরি-ঝর্ণা শুকিয়ে যাওয়ার কারনে প্রত্যান্ত এলাকাসহ লামা ও বান্দরবান সদর পৌর এলাকায় পানি সংকট আরও তীব্র আকারে দেখা দিয়েছে।

লামা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী সূত্র মতে, প্রতিনিয়ত নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, অবাধে পাথর উত্তোলন ও নানা ধরনের বনজ সম্পদ আহরনের ফলে পানির উৎস খ্যাত বিভিন্ন ঝিরি ও পাহাড়ী ঝর্ণার পানি শুকিয়ে গেছে। স্থানীয়রা ঘন্টার পর ঘন্টা পায়ে হেঁটে কয়েক মাইল পথ পাড়ি দিয়ে ঝিরি-ঝর্ণা থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। পানির চাহিদা মেটাতে জেলা পরিষদ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী বিভাগ ও বিভিন্ন এনজিও সংস্থা বিগত কয়েক বছরে কয়েক হাজার রিংওয়েল-নলকুপ খনন করে। অভিযোগ রয়েছে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানগুলো রিংওয়েল-নলকুপ খননে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে পানি উঠে না। অধিকাংশ কল অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

এদিকে লামা উপজেলার রুপসীপাড়া, গজালিয়া, সরই, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন, রুমা উপজেলার বগালেক, নীলগিরির পাশে এম্পু পাড়া, বলিবাজার, সহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, জেএফএস এর প্লাস্টিকের পাইপ গুলো ভেঙ্গে পানির হাউজ গুলো অকেজো হয়ে পড়ে রয়েছে। আর বান্দরবান ও লামা পৌর এলাকায় একদিন পর পর ঘন্টা খানেকের জন্য পানি সরবরাহ করা হলেও বহুতল ভবনে মোটর ব্যাবহার করে পানি সংগ্রহ করার কারণে গরিব দুঃখি মানুষ গুলো বিশুদ্ধ পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

টংকাবতী চেয়ারম্যান পাড়ার বাসিন্দা রিংয়ং মুরুং জানান, পাড়ার ঝিরি দিয়ে পাথর ভর্তি ট্রাক চলাচল করায় ঝিরির পানিও ঘোলা হয়ে যাচ্ছে। পাড়ায় পানির খুব অভাব আর অভাবের কারণে পাড়ার লোকজন বাধ্য হয়ে ঝিরির ঘোলা পানি ব্যবহার করছে। খাবার পানি পেতে হলে অনেক দুর পাহাড়ী পথ পায়ে হেটে যেতে হয়।

লামা তাউ পাড়ার বাসিন্দা চংবট মুরুং জানান, বিগত ৮/৯ বছর আগে তাদের পাড়ার পাশে ঝিরি থেকে সারা বছর খাবার পানি পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে  গ্রীস্ম আসার আগেই ঝিরির পানি শুকিয়ে গেছে। এখন তাদের পাড়ার অনেক নিচে গিয়ে আবার আরেকটি পাহাড় পাড়ী দিয়ে অন্য ঝিরি থেকে পানি সংগ্রহন করতে হচ্ছে।

আলীকদম উপজেলার একাধিক পাড়া কারবারীরা জানিয়েছেন, পার্বত্য জেলা পরিষদ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ ও এনজিও সংস্থাগুলোর উদ্যোগে নির্মিত রিংওয়েল, গভীর নলকুপ, পাতকুয়া এবং প্রাকৃতিক উৎস থেকেও বর্তমানে পানি পাওয়া যাচ্ছে না।

লামা শহরের নুনারবিল পাড়ার থোয়াইক্য মার্মা জানান, দুই তিন দিন পরপর আমরা যা পানি পাচ্ছি তা আমাদের চাহিদার তুলনায় অনেক কম। ফলে পানির চাহিদা মেটাতে হোটেল রে¯েঁÍারাসহ সবাই পুকুরের দুষিত পানি খাবার সহ বিভিন্ন কাজে ব্যাবহার করছে।

পরিবেশবাদীদের মতে, প্রাকৃতিক বন ও বনাঞ্চলে গাছ পালা না থাকায় জেলায় পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। পার্বত্য এলাকায় প্রকৃতিক বন, পাথর ও বৃক্ষের শিঁকড় থেকে ঝিরি-ঝর্ণা ও নদীর পানির মূল উৎস। পাহাড়ী ছড়া, ঝিরি-ঝর্ণা ও নদীর পাশে যে সমস্ত বাঁশ, লতা-পাতা, ফার্ণ ও বৃক্ষগুলো  রয়েছে সেগুলোই হচ্ছে পানির উৎস সৃষ্টির সহায়ক উদ্ভিদ। বর্তমানে পাহাড়ে ঝিরি-ছড়া ও পাহাড়ী ঝর্ণার পাশে কোন ধরনের গাছ পালা থাকায় এলাকায় পানির অভাব দেখা দিয়েছে।

এ ব্যাপারে বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ সোহরাব হোসেন জানান, বান্দরবান জেলায় নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, অবাধে পাথর উত্তোলন ও অপরিকল্পিত জুম চাষের ফলে জেলায় পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। তাই গ্রীস্মের শুরুতেই পানির অভাব দেখা দেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*