,

মিয়ানমার থেকে আসছে স্বর্ণ: যাচ্ছে ভারতে

আখতার হোসেন হিরু, টেকনাফ []স্বর্ণ
টেকনাফে বেড়ে চলছে স্বর্ণ চোরাচালান ও অবৈধ স্বর্ণ ব্যবসা। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বিজিবিসহ প্রসাশনকে ফাঁকি দিয়ে চোরাই পথে স্বর্ণ নিয়ে আসছে চোরাকারবারীরা। তাদের প্রধান গ্রাহক ইয়াবা ব্যবসায়ী, অধিকাংশ স্বর্ণকার মিয়ানমারের অবৈধ নাগরিক। স্বার্ণের চাহিদা মেটাতে চোরাই পথে আসছে ভেজাল স্বর্ণ ও মূল্যবান এক ধরনের পাথর। ফলে মিয়ানমারে পাচার হয়ে যাচ্ছে দেশীয় মুদ্রা। সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব।
সরে জমিনে ঘুরে দেখা গেছে, টেকনাফের হোয়াইক্যং, হ্নীলা, হ্নীলার চৌধুরী পাড়া, সাবরাং ও টেকনাফ পৌরসভায় নামে বেনামে প্রায় শতাধিক স্বর্ণকার ও জুয়েলারী দোকান রয়েছে। হাতেগোনা কয়েকটি দোকানছাড়া অধিকাংশ দোকানে সরকারী বৈধ কোন লাইসেন্স নেই। নাম মাত্র ট্রেড লাইসেন্স দিয়ে অবৈধভাবে চালিয়ে যাচ্ছে এসব ব্যবসা। যদিও তারা নিজেদের দোকানের সামনে স্বর্ণকারের দোকান সাইনবোর্ড টাঙিয়ে রাখলেও তার অন্তরালে চলছে অবৈধ স্বর্ণ ও পাথর ব্যবসা। এইসব স্বর্ণের দোকান গুলোর প্রধান গ্রাহক স্থানীয় ইয়াবা ব্যবসায়ী বলে জানা গেছে। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ছোট বড় স্বর্ণের দোকানগুলোতে টেকনাফের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা মহিলাদের ভীড় চোখে পড়ার মতো।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সম্প্রতি ইয়াবা ব্যবসায়ীদের অবৈধ উপার্জন খুঁজে সরকারী গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা তৎপর হওয়ার প্রেক্ষিতে ব্যাংকের পরিবর্তে স্বর্ণ মজুদ করছে । সেই সুযোগ কে কাজে লাগিয়ে কথিত স্বর্ণকারের দোকানগুলোতে বিরামহীনভাবে কাজ করে যাচ্ছে স্বর্ণের কারিগররা। এদের মধ্যে অধিকাংশ স্বর্ণকার মিয়ানমার থেকে অবৈধ পথে এসে কাজ করে যাচ্ছে অনায়াসে। অথচ প্রশাসনের নজরদারী নেই। প্রতিদিন প্রত্যেক দোকানে শহরের নামি দামী জুয়েলার্স গুলোর চেয়ে বেশী ব্যবসা হয় বলে স্থানীয়দের অভিমত। ভূক্তভোগী শাহপরীরদ্বীপ এলাকার প্রবাসীর স্ত্রী রোজিনা অভিযোগ করেন, রাখাইন স্বর্ণকারের দোকান গুলোতে অলংকার তৈরী করতে গেলে প্রতি ভরিতে এক আনা খাঁদ দিয়ে অর্ডার নেন কিন্তু একই স্বর্ণ তাদের কাছে বিক্রি করতে গেলে ৩ আনা খাঁদ কেটে রাখে। যদি তাতে রাজি না হয় তারা স্বর্ণ কিনতে অপারগতা স্বীকার করেন। অনুসন্ধানে আরো বের হয়েছে এসব দোকান গুলোতে অলংকার তৈরী করতে গেলে তারা শুধু সাদা কাগজের টুকরায় স্লিপ আকারে লিখে দেয়। তাদের নেই কোন ছাপানো রশিদ বই। স্বর্ণকারের দোকানে পুরাতন গহনা ভেঙ্গে নতুন গহনা তৈরী করা হলেও এসব স্বর্ণকারের দোকানের বেলায় ঘটে ভিন্নমাত্রা। গ্রাহকরা স্বর্ণের গহনা বা অলংকার তৈরী অর্ডার দিলে উক্ত দোকান দারেরা তা সরবরাহ করে থাকে। কিন্তু এত বেশী পরিমাণ স্বর্ণ কিভাবে কোথা থেকে তারা সংগ্রহ করে থাকে তা জানতে চাওয়া হলে স্বর্ণকার মংপ্রু রাখাইন জানান, স্থানীয় বিভিন্ন বিক্রেতাদের কাছ থেকে গহণা কিনে তা খাঁটি করা হয়। পরবর্তীতে তা গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করা হয়। কিন্তু স্থানীয় বাজারে যে পরিমাণ স্বর্ণের চাহিদা রয়েছে তা পূরন করা সম্ভব হচ্ছেনা। বাকী স্বর্ণ কোথা থেকে আনা হয় এমন প্রশ্নে উক্ত রাখাইন স্বর্র্র্র্র্র্র্র্ণকারের দোকান গুলো কোন সদুত্তর দিতে পারেন নি এবং স্বর্ণ ক্রয়ের সঠিক কোন রশিদ দেখাতে পারেনি।
স্থানীয় সূত্রে জানাগেছে, স্থানীয় একটি স্বর্ণ ও পাথর চোরকারবারী সেন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে রাখাইন এবং হিন্দু স্বর্ণকারদের দিয়ে আতাঁত করে মিয়ানমার থেকে চোরাই পথে স্বর্ণ আমদানী করে দেশের অভ্যন্তরে চালান করে দিচ্ছে। ফলে একদিকে সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব অন্যদিকে দেশের মুদ্রা পাচার হয়ে যাচ্ছে মিয়ানমারে। সাম্প্রতিক কালে বিজিবিরি হাতে ২টি স্বর্ণের চোরাচালান আটকা পড়লেও বের করা সম্ভব হয়নি স্বর্ণ চোরাকারবারী ও মূল হোতাদের । অন্যদিকে ইয়াবা ব্যবসার উপর সরকারের কঠোর অবস্থানের ফলে এখন নতুন ভাবে রাখাইন স্বর্ণকারদের সাথে সিন্ডিকেট করে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা স্বর্ণ চোরাচালানে জড়িয়ে পড়েছে বলে এলাকায় বহুল প্রচার রয়েছে।
এ ব্যাপারে টেকনাফ মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ আতাউর রহমান খোন্দকার জানান, লাইসেন্স বিহীন জুয়েলারী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঠিক তথ্য জানা নেই। তবে এব্যাপারে শিগগিরই অনুসন্ধানের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহন এবং দোকান মালিক বিরুদ্ধে মিয়ানমার থেকে চোরাইপথে স্বর্ণ এনে মজুদ করে গ্রাহকদের কাছে দেয়ার সূনির্দিষ্ট তথ্য পেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
৪২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক মোঃ আবু জার আল জাহিদ জানান, স্বর্ণচোরাচালানসহ যে কোন চোরাচালান ঠেকাতে বিজিবি সর্বদা সীমান্তে সতর্কবস্থায় রয়েছে। ইতিমধ্যে বিজিবি জওয়ানরা কয়েকটি স্বর্ণের চোরাচালান জব্দ করতে সক্ষমও হয়েছেন। চোরাচালানীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে অভিযান পরিচালনা করা হবে। এছাড়া ভারতের বাজারে স্বর্ণের চাহিদা ও দর বেশী থাকার কারনে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশে স্বর্ণের চালান নিয়ে অনুপ্রবেশ করছে চোরাচালানীরা। গত ১ মে ৯৭ ভরি স্বর্ণসহ আটক পাচারকারীরাও জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য জানিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
স্বর্ণ চোরাচালান অব্যাহত থাকলে দেশীয় স্বর্ণের বাজারে ধ্বস নামবে এবং সরকার অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পড়বে। তাই ব্যাপক অনুসন্ধানের মাধ্যমে এইসব স্বর্ণ চোরাকারবারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবী জানিয়েছেন এলাকার সচেতনমহল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*