,

প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের ঝূঁকি বাড়ছে!

কামরুল ইসলাম মিন্টু[]Santmarten

আগামী ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষ। পুরো দেশ নতুন বাংলা বছরকে বরণ করতে এখন থেকে উৎসবের আয়োজনে মেতে উঠেছে। ঠিক তখন দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে বৈশাখী আতংক চলছে এখানকার ব্যবসায়ী এবং স্থানীয়দের। গত বছর বর্ষা মৌসুমে প্রথমবারের মতো বন্যা এবং জলোচ্ছ্বাসে আক্রান্ত হয় এই দ্বীপটি। এরপর থেকে এখানে প্রকৃতির বৈরী আবহাওয়াকে বিষণভাবে বয় পাচ্ছেন সর্বমহল। এবার বৈশাখের দামাকা খুশির উল্লাস নয় বিষন্নতার কারণ হয়েছে সেন্টমার্টিনবাসীর।

জানা যায়, সাগর বেষ্টিত ঝুঁকির উপর দাঁড়িয়ে থাকা প্রবাল দ্বীপ লক্কর ঝক্কর বেড়িবাঁধের দোহাই দিয়ে বিশাল সাগর প্রতিবছর কক্সবাজার উপকূলের খন্ড খন্ড অংশ তার দখলে নিয়ে যাচ্ছে। এতোটা বছরের প্রত্যেকটি প্রাকৃতিক দূর্যোগে কক্সবাজার উপকূলের অনেকটা অংশ গিলে ফেলেছে সাগর। কিন্তু সাগর বেষ্টিত সেন্টমার্টিন দ্বীপ অলৌকিক ভাবে বেঁচে যায় সকল ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে। পুরো দেশের উপকুল যখন যে কোন দুর্যোগে তার চিত্র পাল্টিয়ে দিশেহারা হয়ে যায় এখানে বসবাসকারী মানুষ গুলো। তখনওসেন্টমার্টিন তথা প্রবাল দ্বীপটি থাকে সম্পূর্ন সুরক্ষিত। এর কারণ হিসেবে পরিবেশবাদীরা বলছেন, এখানে বসবাসকারী মানুষ গুলো এই দ্বীপটিতে শুধুই বসবাস করে আসছে। সহজ সরল ও কর্মঠ এখানকার মানুষেরা বিশেষ করে নদী আর সাগরে মাছ শিকার করে জীবন অতিবাহিত করে থাকেন। ছোট টিনশেড আর কুটির বানিয়ে সেন্টমার্টিনের বাসিন্দারা আদলে ধরে রেখেছিল নিজেদের জন্মভূমিটিকে। যার কারণে হালকা স্থলের উপর দাঁড়িয়ে এতোদিন তারা বেশ সুখেই ছিল। বোদ্ধারা বলছেন, পর্যটন শিল্প বিকাশের দোহাই দিয়ে ৯০ দশকের পর থেকে সেন্টমার্টিনে একের পর এক গড়ে উঠে প্রাসাদ। প্রতিবেশ ও পরিবেশগত সংকাটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষিত সেন্টমার্টিন দ্বীপকে দিন দিন গড়ে তুলে ইট আর কনক্রিটের বস্তিতে। পুরো সাগরের উপর দাড়িয়ে যে সেন্টমার্টিন দ্বীপ, সেই হালকা স্থলের উপর স্থাপন করা হয় সু-উচ্চ দালান-কোঠা। শুধু তাই নয়, এখান সেন্টমার্টিন রক্ষার যে প্রাকৃতিক ভাবে গড়ে উঠা পাথর,বালি রয়েছে তা উত্তোলন করে ব্যবহার করা হয়েছে ওই প্রাসাদ নির্মাণ কাজে। এখনো তা অব্যাহত রয়েছে প্রতিযোগীতার সাথে। তাই জন্য দিন দিন ঝুঁকির মধ্যে নিমজ্জিত হচ্ছে দেশের এই প্রকৃতির অনন্য দৃষ্টান্তের শহর সেন্টমার্টিন দ্বীপ। পরিবেশবাদীরা বলছেন, যত্রতত্রভাবে স্পর্শকাতর জায়গায় ভারী কিছু ভর করায় এটি এখন প্রাকৃতিক তান্ডবে ক্ষতিগ্রস্থ হতে শুরু করেছে। ইতিহাসের প্রথমবার গতবছর যেভাবে সামান্য জলোচ্ছ্বাসে সেন্টমার্টিন আক্রান্ত হয়েছে তাতেই এই কোরাল দ্বীপকে বাঁচানো সম্ভব পর হবেনা বলে আশংকা ওই পরিবেশবাদীদের।
জানা যায়, গত ২০১৩ সালের শেষের দিকে জলোচ্ছ্বাসে আক্রান্ত হয় সেন্টমার্টিন দ্বীপ। আর এসময় জোয়ােেরর পানি ৮ থেকে ১০ ফুট বৃদ্ধি পেয়েনিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। সাগরের ঢেউ জনবসতিতে এসে পড়তে শুরু করে। এতে দ্বীপের চর্তুদিকে ভাঙ্গন ধরে। বেশি ভাঙ্গন ধরে উত্তর ও পশ্চিম অংশে এতে উত্তর পাড়ার আবদুস সালামের পুত্র হাফেজ আহম্মদ, ফজল আহমদের পুত্র শামসুল আলম, ফজল আহমদের পুত্র রবিউল আলম ,ফয়জুর রহমানের পুত্র ছদু মিয়া, সিরাজুল ইসলামের পুত্র শামসুল আলম, আবদুর রাজ্জাকের পুত্র মোঃ ছিদ্দিক, নজির আহমদের মেয়ে ফাতেমা খাতুন, হাবিবুর রহমানের পুত্র আবদুল কুদ্দুস, নজির আহমদের মেয়ে মরিয়ম খাতুন, কবির আহমদের পুত্র সাবের এবং মছিউল্লাহ, ছৈয়দ উল্লাহ, আমিন উল্লাহ, মছিউল্লাহ, ৯নং ওয়ার্ড দক্ষিণ পাড়া দুদুমিয়ার পুত্র ফজল আহমদ এবং ডেইল পাডার আমিন উল্লাহ, শামসুল আলম, মোঃ রফিক, ফিরুজা বেগমের বসতবাড়ী বিধ্বস্থ হয়েছে। এছাড়া বসতভিটা সাগরে বিলীন হয়ে যায়। আর এখন পানি নেমে যাওয়ার পর দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্র্টিনের ভয়াবহ ভাঙ্গণের ভয়াবহতা চরমভাবে ফুটে উঠে। জলবাযু পরিবর্তনের বিরুপ প্রভাবে ইতিহাসের প্রথম দ্বীপের চতুর্দিকে একযোগে ভয়াবহ ভাঙ্গনে দ্বীপবাসী চরম আতংকে পড়ে। সেন্টমার্টিনদ্বীপের চেয়ারম্যান নুরুল আমিন সংবাদকর্মীদের জানান -গত ২০১৩ এর ২৭ মে দুপুর থেকে ২জুন পর্যন্ত প্রবল জোয়ারে সেন্টমার্টিনদ্বীপে স্মরণকালের ভয়াবহ ভাঙ্গন এবং জলোচ্ছ্বাসে ২১টি বসতবাড়ী সাগরে বিলীন, ৮টি কাঁচা ঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্থ, ২টি ফিশিং ট্রলার সম্পূর্ণ বিধ্বস্থ, ২টি বোট আংশিক ভাঙা, ৪টি কাচা ফিশারী ঘর সম্পূর্ণ ভাঙা, ৪টি কাঁচা ফিশারি ঘর আংশিক ভাঙা, ৬টি দোকান বিধ্বস্থ, পানিবন্দি ৭৬ পরিবার, এছাড়া পূর্ব বাজার হতে কোষ্টগার্ড ও নেভী ক্যাম্প পর্যন্ত নির্মাণাধীন রাস্তা ও বঙ্গবন্ধু সড়ক হতে আশ্রয়কেন্দ্র হয়ে পূর্ব বীচ পর্যন্ত কর্মসংস্থান কর্মসূচীর নির্মাণাধীন বাঁধ, অবকাশ হোটেল হতে কোনার পাড়া পর্যন্ত নির্মাণাধীন রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুলিশ ফাড়ী বাউন্ডারী বিধ্বস্থ, পূর্বপাডা হতে ডেইলপাডা হয়ে কবরস্থান পর্যন্ত সী বীচের উত্তরাংশ সম্পূর্ণ ভেঙে যায়। সেন্টমার্টিন ইউপির প্যানেল চেযারম্যান-১ আবদুর রহমান মেম্বার ও আওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি ও মেম্বার আলহাজ্ব নুর আহমদ জানান- সেন্টমার্টিনদ্বীপের ইতিহাসে এত অল্প সময়ের মধ্যে এধরণের ভয়াবহ ভাঙ্গন এবং জলোচ্ছ্বাস ইতিপূর্বে আর হয়নি। এমনকি ইতিহাস বিখ্যাত একাধিক ঘূর্ণিঝড়ে সময়ও এ ধরণের ঘটনা ঘটেনি। এবছরও এই আতংকটি কাজ করছে এখানকার মানুষের মাঝে।

বিজ্ঞরা বলছেন, এটি সেন্টমার্টিনের সুস্থ্য পরিবেশকে অপব্যবহারের কারণে সাগরের তান্ডবের শিকার হতে হচ্ছে। কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক সরদার শরীফুল ইসলাম জানান, সেন্টমর্টিনকে জঞ্জাল মুক্ত করতে কাজ শুরু হয়েছে। যেভাবেই হোক এই দ্বীপকে রক্ষা করা প্রয়োজন। নয়তো সাগরের করাল গ্রাস থেকে একে রক্ষা করা সম্ভব হবেনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*